জটিলতার শেষ নাই

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:১৯

করোনার ভ্যাকসিন এখনো বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশ পায় নাই। যেই অল্পসংখ্যক দেশ ভ্যাকসিনের প্রয়োগ শুরু করিতে পারিয়াছে, তাহার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ইতিমধ্যে করোনার কারণে বিশ্বের ২৪ লক্ষ ৮৭ হাজার মানুষ মারা গিয়াছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র করোনায় মৃত্যুতে ৫ লক্ষের দুঃসহ মাইলফলক স্পর্শ করিয়াছে। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভগ্নহূদয়ে বলিয়াছেন, জাতি হিসাবে আমরা এই ধরনের নিষ্ঠুর ভাগ্য মানিয়া লইতে পারি না। এইদিকে ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি ভারতের মহারাষ্ট্রে করোনার নূতন ধরন দেখা দিয়াছে, যাহা অনেক অধিক সংক্রামক।

বিপদ হইল, করোনা হইতে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাইতে হইলে একটি দেশের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার সুরক্ষার আওতায় আসিতে হইবে। এই ব্যাপারে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পক্ষে দেওয়া একটি পূর্বাভাসে বলা হইয়াছে, বিশ্বের কোনো কোনো দেশে সকল মানুষকে টিকাদানের কর্মসূচি শেষ করিতে ২০২৩ সাল পার হইয়া যাইবে, আবার কোনো কোনো দেশে সবাইকে টিকা দেওয়া কখনই হয়তো শেষ হইবে না। সেই ক্ষেত্রে কী হইতে পারে? এতদিন ধরিয়া করোনা ভাইরাস নানানভাবে ছড়াইবার সুযোগ পাইবে এবং ভাইরাসটি অবশ্যই অনেকবার চরিত্র পরিবর্তন করিবে এবং মানুষের মাধ্যমে অন্য দেশে গিয়া পৌঁছাইবে। সেই ক্ষেত্রে ভাইরাসটি ভ্যাকসিন-প্রতিরোধীও হইয়া যাইতে পারে। এবং এইভাবে নূতন চেহারা নেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখিবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই কারণে দ্রুত ও অধিকসংখ্যক মানুষের উপর টিকা প্রয়োগে জোর দিয়াছেন। বাংলাদেশের আঠারোর ঊর্ধ্বে প্রায় ১৩ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করিয়াছে সরকার। অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ বটে। ইতিমধ্যে ২৩ লক্ষাধিক মানুষ টিকার প্রথম ডোজের আওতায় আসিয়াছে। অর্থাত্ প্রথম ডোজের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার মাত্রা ১ শতাংশের কাছাকাছি সম্পন্ন হইয়াছে। কিন্তু বিশ্বের ১৩০টি তুলনামূলক গরিব দেশ যেমন এখনো টিকা প্রদান শুরুই করিতে পারে নাই, তেমনি বাংলাদেশেও গরিব বা নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার ঘটনা খুবই কম। অথচ আমাদের দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই অধিক।

আমরা যদি দেশের বস্তি কিংবা ভাসমান মানুষকে, দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষকে টিকা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করিতে না পারি, তাহা হইলে টিকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হইবে না। এই ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হইতেছে—সুরক্ষা অ্যাপস কিংবা ইহার ওয়েবসাইটে গিয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে টিকার জন্য নাম নিবন্ধন করা। দেখা যাইতেছে, গরিব মানুষ জানেনই না কীভাবে টিকা লইবেন, কোথায় যাইবেন, টিকা দিতে যে নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়—তাহা কীভাবে করিবেন? স্মার্টফোন তাহাদের নাই। ধরিয়া নেওয়া হইল, এলাকার কোনো কম্পিউটার দোকান হইতে ২০-৩০ টাকা খরচ করিয়া তাহারা নিবন্ধন করাইতে গেলেন। দেখা গেল, অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নাই। অনেকের থাকিলেও তাহা হয়তো দেশের বাড়িতে গচ্ছিত আছে। অনেকের হারাইয়া গিয়াছে। করোনা ভাইরাস তো আর দেখিতে যাইবে না যে উহার জাতীয় পরিচয়পত্র নাই; সুতরাং উহাকে মাফ করিয়া দিলাম। বরং ভ্যাকসিনের অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া প্রতিটি মানুষই করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য বাহক। আর সম্ভাব্য বাহক থাকা মানেই করোনা ভাইরাসও তাহাদের অবলম্বন করিয়া টিকিয়া থাকিবে। 

জটিলতা অবশ্য আরো অনেক আছে। কাহারো করোনা হইলে উহার অ্যান্টিবডি ছয় মাস অবধি থাকিতে পারে। আবার ভ্যাকসিন লইলে এক বত্সর বা সুনির্দিষ্ট কতদিন সুরক্ষিত থাকা যাইবে, তাহাও নিশ্চিত নহে। অন্যদিকে করোনার নূতন ধরন ছড়াইয়া পড়িলে তাহার জন্য হালনাগাদ ভ্যাকসিন লাগিতে পারে, পূর্ববর্তী অ্যান্টিবডি কাজে নাও লাগিতে পারে। অর্থাত্ জটিলতার শেষ নাই। তাহার পরও ‘সর্বস্তরে’ টিকাকরণ করাটাই আপাতত সমাধান। এবং এই ক্ষেত্রে নিচের বড় স্তর বাদ পড়িলে আখেরে লাভ হইবে না।