নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার অনুসারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মজাক্কির নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মুজাক্কির হত্যার তিনদিন পর গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় তার বাবা চর ফকিরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াব আলী মাস্টার বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের নামে এ মামলা দায়ের করেন। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেফতার ও মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত শুক্রবার বিকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চাপরাশির হাট পূর্ব বাজারে আওয়ামী লীগের দু্ই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল ও বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার অনুসারীদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হন দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার ও অনলাইন নিউজপোর্টাল বার্তা বাজারের স্থানীয় প্রতিনিধি মুজ্জাকির। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে প্রথমে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে রাতেই তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় পরদিন শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত মুজাক্কিরের পিতা নোয়াব আলী মাষ্টার কান্না জড়িত কণ্ঠে গতকাল ইত্তেফাকের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি জাফর উল্যাহ পলাশকে বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। সুষ্ঠু তদন্ত করে আমার ছেলের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে ফাঁসি দিতে হবে।’
মামলা দায়েরের পর কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই সরোজ রতন আশ্চার্য্যের নেতৃত্বে একদল পুলিশ গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহত মুজাক্কিরের চরফকিরার বাড়িতে যান। সেখান থেকে মুজাক্কিরের ব্যবহূত মোবাইল, ক্যামেরা ও মানিব্যাগ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। মোবাইল ও ক্যামেরার কোনো মেমোরি কার্ড পাওয়া যায়নি বলে জানান এসআই সরোজ রতন।
মুজাক্কিরকে হত্যার প্রতিবাদে সোমবার রাতেই বসুরহাট রূপালী চত্বরে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। মামলার বিষয়ে আবদুল কাদের মির্জা ইত্তেফাকের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘এব্যাপারে আমার স্পষ্ট বক্তব্য ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। তদন্তে আমার নাম আসলে আমাকেও গ্রেফতার করা হোক।’
কাদের মির্জা আরও বলেন, ‘সোমবার রাতে নোয়াখালী জেলার এএসপি দীপক জ্যোতি খীসা আমাকে বলেছিলেন- আপনাদের আর কিছু হবে না, আপনারা শান্ত থাকেন। কিন্তু রাতেই পুলিশ চরফকিরার পাটোয়ারী বাড়ির আমার দলের নেতা রুহুল আমিনকে আটক করেছে এবং পেশকারহাটে উপজেলা যুবলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রহমান কচির বাড়িতে তল্লাশি চালায়। নোয়াখালীর তথাকথিত এমপি একরামুল করিম চৌধুরী ডিসি ও এসপির সাথে মিটিং করেছে, আমাকে এবং আমার লোকজনকে ফাঁসানোর জন্য।’
বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ সমাবেশ
সাংবাদিক মুজাক্কিরকে হত্যার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা মানবনবন্ধন, সমাবেশ করেছেন। বেলা সাড়ে ১১টায় মাইজদীতে নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, রিপোর্টার্স ক্লাব ও তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি নামে সাংবাদিকদের তিনটি সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন-সমাবেশ করা হয়। একই দাবিতে বেলা ১২টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘নিরাপদ নোয়াখালী চাই’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনে এনএস রোডে গতকাল সাংবাদিকরা মানবন্ধন করেছেন। মুজাক্কিরের খুনিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে আজ বুধবার বেলা ১১টায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ডিইউজে ও বিএফইউজের একাংশ।
ভ্যাকসিনের সচেতনতামূলক সমাবেশে বাধা
গতকাল বিকাল ৪টায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট রূপালী চত্বরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিককে করোনার টিকা নেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক সমাবেশের আয়োজন করেন বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। এসময় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ম্যাজিষ্ট্রেট সুপ্রভাত চাকমা, নোয়াখালীর হাতিয়া সার্কেলের এএসপি মো. ফারুক, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি ও ওসি (তদন্ত) রবিউল হকের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সমাবেশ পণ্ড করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এব্যাপারে মেয়র আবদুল কাদের মির্জা বলেন- এটা অন্যায়, অবিচার ও জুলুম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কোভিড ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রশাসন বিনা উস্কানিতে এ সমাবেশ পণ্ড করে দিয়েছে। অথচ চাপরাশিরহাট বাজারের প্রধান সড়কের ওপর যান ও জন চলাচল বন্ধ করে মঞ্চ তৈরি করে প্রতিপক্ষ প্রশাসনের সহযোগিতায় সমাবেশ করছে। এবিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউল হক মীর বলেন, বসুরহাট রূপালী চত্বরে কেউ সভা-সমাবেশ করতে পারবে না। চাপরাশিরহাটে চলাচলের পথ বন্ধ করে সমাবেশ করা যাবে না।
কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগও সহযোগী সংগঠনের সকল কার্যক্রম স্থগিত
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। একই সাথে নতুন সকল কমিটি বাতিল এবং পুরনো সকল কমিটি পূনর্বহাল থাকার নির্দেশ দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দলীয় হাইকমান্ড নির্দেশে এ স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে এবং দলীয় শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এসময় কোন নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকেও লাইভে এসে কোনো ধরনের রাজনৈতিক উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন না। তিনি আরো জানিয়েছেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি কমিটি ভেঙ্গে নতুন কমিটি করা হয়েছে। তা বাতিল করে পুরনো কমিটি বহাল রাখার নির্দেশও দিয়েছেন দলের হাইকমান্ড।
