মইদুল, তোমার অপরাধ কী? তুমি গত সপ্তাহে কলকাতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে বাঁকুড়া জেলার ছাতনা থেকে কলকাতায় এসেছিলে। তুমি যোগ দিয়েছিলে পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার যুবক-যুবতির সঙ্গে চাকরির দাবিতে মিছিলে। তোমার বয়স মাত্র ৩১ বছর। আর ফিরে গেল কফিনবন্দি তোমার নিথর দেহটা। সেদিন অর্থাত্ গত বৃহস্পতিবার চাকরির দাবিতে বাম কংগ্রেস জোটের ছাত্র-যুবরা সমস্ত জেলা থেকে একটি দাবি নিয়ে এসেছিলেন। দাবিটি ছিল অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া। কলকাতার রাস্তায় সেদিন আমরা দেখেছি, সারা দেশের লোক দেখেছে, টিভির পর্দায়, কীভাবে পুলিশের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছ তোমরা। পুলিশের লাঠির ঘায়ে আহত প্রায় ৩০০ ছাত্র-যুবাকে ভর্তি হতে হয়েছে হাসপাতালে।
তুমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিন দিন ধরে ছটফট করেছ। আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারিনি। বাম ও কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের একটি পরিকল্পিত ‘খুন’। আর এই খুন করেছে লালবাজার। যারা খুন করেছে তারাই আবার খুনের তদন্ত করবে। বামপন্থি নেতারা ও আইনজীবীরা মনে করেন, মইদুলের মৃত্যুর দায় লালবাজারের কর্তাদের। এই মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের হওয়া উচিত বলে অভিমত তাদের। বাম নেতাদের অভিযোগ, পুলিশের লাঠির আঘাতেই পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কিডনি বিকল হয়েছে তার। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তথা রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, ‘নিরস্ত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর এভাবে লাঠি চালানো যায় না। এর দায় সরকারের। এই মৃত্যু নিয়ে মানবাধিকার কমিশনেও অভিযোগ জানানো যায়।’ কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন লালবাজারকেই। বলেছেন, ‘পুলিশই হত্যা করেছে মইদুল ইসলাম মিদ্যাকে। দোষ প্রমাণিত হলে চাকরি যেতে পারে পুলিশ কমিশনারসহ পদস্থ কর্তাদের।’ রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন আইজি পঙ্কজ দত্ত বলছেন, ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত করে আঘাতের ধরন নিশ্চিত করা উচিত প্রশাসনের। অস্বাভাবিক কোনো আঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে দোষী পুলিশকর্মীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মৃতের পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারে।
মইদুল, পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা জানত, ১০ বছর আগে এ রাজ্যের শাসক দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বছরে দেড় কোটি লোককে চাকরি দেবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই প্রতিশ্রুতি ছিল এক বড় ধরনের ভাঁওতা। সঠিক কত লোককে চাকরি দিয়েছে, এই পরিসংখ্যানও গত ১০ বছরে জনগণকে দেয়নি সরকার। কত বেকার যুবক আত্মহত্যা করেছে, সেই পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি।
দিল্লির সরকার সাত বছর আগে ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বছরে ২ কোটি লোকের চাকরি হবে। সেই হিসাবে সাত বছরে ১৪ কোটি লোকের চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত বছরে কেন্দ্রীয় সরকার মাত্র ১৪ লাখ লোককে চাকরি দিয়েছে। ভারতে করোনাকাল এখনো শেষ হয়নি। এই ১১ মাসের করোনাকালে কোটি কোটি লোক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। সুতরাং রাজনৈতিক দলের নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় না কখনোই। সেজন্যই মইদুল তোমাদের মরতে হয় এভাবে।
মইদুল, তুমি তখন জন্মাওনি। তুমি সেদিন যে পথে নবান্নের দিকে যাচ্ছিলে, সেই পথেই সাংবাদিকরা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে তাদের বেতনকাঠামোকে সরকারি আইনের মধ্যে আনার জন্য। সে সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। বিধানবাবুর পুলিশ সেদিন সাংবাদিকদের ওপর একই কায়দায় বিনা প্ররোচনায় লাঠি চালিয়েছিল। আহত হয়েছিলেন অনেক সাংবাদিক। তারপরই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সাংবাদিক ও অসাংবাদিকদের জন্য সংসদে একটি আইন পাশ করেন। সেই আইন আজও চালু আছে। সেদিনকার সরকার—কি কেন্দ্র, কি রাজ্য—মানুষের দাবি মেনে নিত। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লি কিংবা রাজ্য—কোনো সরকারই আর মানুষের দাবিদাওয়া মেনে নেয় না। এ আমাদের বড় দুর্ভাগ্য।
তারা যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসে, সেই মানুষের কোনো দাবিদাওয়া তো তারা মানেই না, বরং সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা হয়। এ তামাশা ছাড়া আর কী? পাঁচের দশকের ঐ ঘটনার জেরে সংবাদপত্রগুলি, বিশেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর তাদের সম্পাদকীয়তে জোরালো বক্তব্য পেশ করেছিল। আনন্দবাজার লিখেছিল, পুলিশ জননীর গর্ভের লজ্জা। যুগান্তরে লেখা হয়েছিল পুলিশ ব্রিটিশের জারজ সন্তান।
মইদুল, তোমাকে হত্যার প্রতিবাদে ১৭ ফেব্রুয়ারির আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে :
জনতাকে কীভাবে ছত্রভঙ্গ করতে হয়, কলকাতা পুলিশ তা জানে না, কথাটি বিশ্বাস করার মতো নয়। ইতিহাস, এমনকি সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে প্রতিবাদী জনতা সামলানোর অভিজ্ঞতা তাদের বিপুল। তবু, বামপন্থি সংগঠনগুলির নবান্ন অভিযানের দিন কলকাতা পুলিশ তাদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা লালবাজারে তালা দিয়ে রেখে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীতে পরিণত হলো। মিছিল থেকে উসকানি ছিল—এই অজুহাত পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়, কেননা মিছিলের জনতা যে বিশৃঙ্খল হতে পারে, মারমুখী হতে পারে—এই সব কথা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়। এই কথাটিও জানা যে, জনতার, বিশেষত নিরস্ত্র জনতার শক্তির সঙ্গে পুলিশের শক্তির কোনো তুলনাই চলে না। ফলে বেশি শক্তিধরের দায়িত্ব স্বীকার করে সংযত থাকাই পুলিশের কর্তব্য ছিল। কলকাতার রাজপথ সাক্ষী, পুলিশ সেই দিন নিজের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ। মইদুল ইসলাম মিদ্যা নামক এক যুবক নিজের প্রাণের মূল্যে বুঝিয়ে দিলেন, রাষ্ট্রশক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। এই মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। এবং দোষীদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। হাতে লাঠি বা বন্দুক থাকলেই যে তার যথেচ্ছ প্রয়োগ করা চলে না, মানবাধিকার নামক বস্তুটি শত প্ররোচনা সত্ত্বেও পুলিশকে মেনে চলতে হয়, কলকাতার অভিজ্ঞ পুলিশ বাহিনীকে আরো একবার কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি।...
মইদুল, গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তোমার আত্মার শান্তি কামনা করছে। তুমি ভালো থেকো।
n লেখক :ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
