বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের অফিস দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের হয় একাধিক মামলা। এর মধ্যে একটি মামলায় ৩০ আসামি হাইকোর্টের আগাম জামিনের জাল আদেশ প্রস্তুত করে দাখিল করেন বগুড়া সদর থানা পুলিশের কাছে। সেই জাল আদেশবলে আসামিরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়ান, দেন মহড়া। এ নিয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হলে এক আইনজীবীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে খোঁজ নেন। এরপরই জাল জামিনাদেশ প্রস্তুতের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ঐ মামলার ৩০ আসামিকে এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেফতারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন। আদালত বলেছে, এই ভয়াবহ জাল-জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এভাবে যদি জালিয়াতি হয় তাহলে কীভাবে বিচার কাজ করব।
আদালতের আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, যারা এই জাল আদেশের সুবিধাভোগী তাদেরকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জালিয়াতি চক্রের হদিস মিলবে। এই জালিয়াতি চক্রকে কঠোর হস্তে দমন ও শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ হবে। তিনি বলেন, এই জাল আদেশের কপিতে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তার অধিকাংশই মিথ্যা।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের অফিস দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজশাহী বিভাগীয় মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এবং মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক ও বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন এই সংঘর্ষের ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করেন।
যেভাবে বেরিয়ে এলো থলের বেড়াল!
এই মামলায় হাইকোর্টে কোনো আগাম জামিনের আবেদন করেননি যুবলীগ নেতা আমিনুলসহ ৩০ আসামি। আবেদন না করেও তারা জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে প্রস্তুত করেন আগাম জামিনের জাল আদেশ। বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের দ্বৈত বেঞ্চের নামে এই জাল আদেশ প্রস্তুত করা হয়। সেই জাল জামিনাদেশ দাখিল করা হয় বগুড়া সদর থানায়। সেই আদেশবলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমিনুল ও তার সহযোগীরা। এতে সন্দেহের সৃষ্টি হলে মোহন গ্রুপের লোকজন থানা থেকে ঐ জামিনাদেশের কপি সংগ্রহ করে তা এক আইনজীবীর মেসেঞ্জারে পাঠান। ঐ আইনজীবী সংশ্লিষ্ট আদেশের কপি নিয়ে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বেঞ্চ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বেঞ্চ কর্মকর্তারা আদেশের কপিটি দেখেই জাল বলে জানান। এরপর ঐ জাল জামিনাদেশের কপি পাঠানো হয় বেঞ্চের দুই বিচারপতির কাছে। এরপরই তা অবহিত করা হয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে। জানানো হয় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকেও। এরপরই গতকাল এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানির এক পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, আমাদের বেঞ্চে কোনো আগাম জামিনের আবেদন শোনা হয় না। কিন্তু এরপরেও জালিয়াত চক্র ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ দিয়ে আমাদের বেঞ্চের দুই বিচারপতির নাম দিয়েই জাল জামিনাদেশ প্রস্তুত করেছে। আর এক্ষেত্রে ফৌজদারি বিবিধ মামলা নম্বর দেওয়া হয়েছে ৪০৫৪২/২১। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাইকোর্টের যেসব বেঞ্চে ফৌজদারি বিবিধ মামলার শুনানি হয় সেসব বেঞ্চের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৮৯০টি আগাম জামিনের শুনানি হয়েছে। সেখানে ৪০৫৪২টি আগাম জামিনের আবেদন কোথায় শুনানি হলো? এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই আদেশের কপিতে জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের যে দুই জন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৯ সালে তারা পদত্যাগ করেছেন। এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালতে আবেদন জানান। বগুড়া সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, আসামিপক্ষ আমাদের একটি জামিন আদেশের কপি দেয়। সেটা আসল না নকল তা যাচাই করার সুযোগ আমাদের নেই।
