পৃথিবীতে আইন অমান্যকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায়শই বলিয়া থাকেন, আমাদের দেশে আইন রহিয়াছে; কিন্তু আইন মানিবার প্রবণতা নাই। এইখানে যাহারা আইন প্রয়োগ করিবেন তাহাদের মধ্যেও দেখা যায় আইন অমান্য করিবার প্রবণতা কাজ করিয়া থাকে।
রাজধানীর ফুটপাতগুলির কথাই ধরা যাউক। বিগত কয়েক বত্সরে ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজের কারণে রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতের চেহারা বদলাইয়া গিয়াছে ইতিমধ্যে। শুধু যে জরাজীর্ণ ফুটপাতগুলি নূতন করিয়া নির্মাণ করা হইয়াছে তাহাই নহে, প্রশস্তও করা হইয়াছে বহু ফুটপাত। উদ্দেশ্য ছিল যানজটকবলিত মহানগরবাসীর হাঁটার পথ অবারিত করা। কিন্তু সংস্কারকাজ শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফুটপাতের বড় অংশ গ্রাস করিয়া থাকে অবৈধ দখলদাররা। কী না হইতেছে রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাতে! ভাসমান হকার, মাদকসেবী ও ভিক্ষুকের উত্পাত তো আছেই, ফুটপাতে এবং সড়কের পাশে বিভিন্ন ভবনের নির্মাণসামগ্রী, অবৈধভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল পার্কিং করিয়া রাখা হয়। ফুটপাত পথচারীদের জন্য তৈরি; কিন্তু সেইখানে তাহাদের অধিকার ক্রমাগত খর্ব হইতেছে। এই চিত্র রাজধানীর অধিকাংশ ব্যস্ত ফুটপাতের। যাহারা গাড়ি ক্রয় করিয়া থাকেন, তাহাদের কি এতটুকু সিভিক সেন্স নাই যে, ফুটপাতে এইভাবে গাড়ি পার্ক করা যায় না? তাহারা কি ন্যূনতম আইনকানুন জানেন না? নিশ্চয়ই জানেন।
আমরা ইহাও দেখিতে পাইতেছি যে, ফুটপাতের সংস্কার হইলেও এইগুলি বহুক্ষেত্রেই যথাযথভাবে তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হইতেছে না। অনেক স্থানে ঢালু পথ করা হইয়াছে; কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পক্ষে নিরবচ্ছিন্নভাবে ফুটপাত ধরে যাতায়াত করা সম্ভব নহে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকল পথচারীর জন্য সমতলে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে সুব্যবস্থার অভাব রহিয়াছে। আমরা ইহাও দেখিতে পাই যে, কান ফাটানো হর্ন বাজাইয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপে ফুটপাত দিয়া তীব্র গতিতে ছুটিয়া চলা মোটরসাইকেলের দাপট থামাইবার জন্য কোনো কোনো ফুটপাতে প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হইয়াছিল; কিন্তু ইতিমধ্যে তাহার অনেক উধাও হইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন হইল, দেশে আইন রহিয়াছে, আদালত রহিয়াছে, আরো রহিয়াছে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট নানা কর্তৃপক্ষ। তাহার পরও কীভাবে একটি দেশের রাজধানীতে দিনের পর দিন এই ধরনের বিশৃঙ্খলা চলিতে পারে? আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে না? ফুটপাতে গাড়ি রাখিবার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ না করিবার ব্যাপারে তাহাদের কি কাহারো ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থ রক্ষা হইয়া থাকে?
এইভাবে আমরা কেন পৃথিবীতে আইন অমান্যে শীর্ষস্থানীয় দেশে পরিণত হইয়াছি? এই প্রশ্নের উত্তরে জড়াইয়া রহিয়াছে এই উপমহাদেশের মূলগত কিছু বৈশিষ্ট্য। আমাদের নৃতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে ইহার উত্তর পাওয়া যাইতে পারে। রাস্তা দখল করিয়া হাটবাজার, খালবিল দখল করিয়া পাট বিক্রয়, ফুটপাত দখল করিয়া সারি সারি দোকান, নিয়ম না মানিয়া রাস্তা ও রেললাইন পারাপার; অতঃপর দুর্ঘটনা—পত্রিকার পাতায় নিত্যদিন আমরা এমন অসংখ্য খবর দেখিয়া থাকি। সাধারণভাবে নিয়ম বা আইনকানুন মানিবার ক্ষেত্রে সততা ও শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এই বাঙালিরাই যখন উন্নত দেশে যান, তখন ঐ দেশটির আইনকানুন-নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটান না। কারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইলেই তাহাকে বেশ ভালো অঙ্কের মূল্য চোকাইতে হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, আইন ও নিয়মকানুন না মানিয়া পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করিতে পারে নাই। প্রকৃতি তথা বিশ্বজগতের ভিতরেও রহিয়াছে সুশৃঙ্খলতার অপূর্ব বিন্যাস। সেই অপূর্ব বিন্যাস দেখিয়া বুঝা যায়, সুশৃঙ্খলাই এই জগতের সবচাইতে বড় সৌন্দর্য। আমাদেরও সেই সৌন্দর্যকে ধারণ করিতে হইবে। এই সৌন্দর্য ব্যতীত জাতি হিসাবে আমরা উন্নতি সাধন করিতে পারিব না।
