ফরিদপুরের রাজনীতিতে এক সময়ের আলোচিত দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের মালিকানাধীন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। ঐ জব্দের আদেশের মধ্যে রয়েছে, ৪৬৭টি দলিলের অধীনে ৫ হাজার ৭০৬ বিঘা জমি, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকসহ ৫৫টি গাড়ি এবং ১৮৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা। ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশ গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল ইত্তেফাককে বলেন, আদালতের এই আদেশের ফলে জব্দকৃত সম্পত্তি ও টাকা অন্যত্র হস্তান্তর ও ব্যবহারের কোনো সুযোগ নাই। জব্দকৃত এসব সম্পত্তি রাষ্ট্রের জিম্মায় থাকবে।
গত বছরের ২৬ জুন সিআইডির পরিদর্শক এস এম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ঢাকার কাফরুল থানায় ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বরকত ও তার ভাই রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঐ বছরের ৭ জুন গ্রেফতারের আগে গত এক দশক ফরিদপুরের উন্নয়ন কাজের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন তারা। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ট সহযোগী ছিলেন রুবেল ও বরকত। সেই সুযোগ নিয়ে তারা ফরিদপুর শহরে কায়েম করেছিলেন ত্রাসের রাজত্ব। জিম্মি করে রেখেছিলেন শহরবাসীকে। তাদের অঙ্গুলি হেলনে তত্কালীন জেলা ও পুলিশ প্রশাসন চলত। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করেই তারা গড়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। এদের অবৈধ দখলের হাত থেকে বাদ যায়নি সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও। পরে পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার করে তাদের কারাগারে পাঠানোর পর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে শহরবাসী।
অর্থ পাচার মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ফরিদপুরের এলজিইডি, বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বরকত ও রুবেল। এছাড়া, মাদক ব্যবসা ও ভূমি দখল করে অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। ২৩টি বাস, ট্রাকসহ বিলাসবহুল গাড়ির মালিক হয়েছেন। উল্লেখযোগ্যপরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। মানি লন্ডারিং আইনে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গত আট মাস ধরে স্পর্শকাতর এই মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্তের এই পর্যায়ে দুই ভাইয়ের জবানবন্দির ভিত্তিতে তাদের সহযোগী ও অর্থ পাচারের সম্পৃক্ত অনেককেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত এখনো চলমান। তদন্তের এই পর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা আলোচিত দুই ভাইয়ের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি জব্দের জন্য মানি লন্ডারিং আইনের ১৪(১) ধারায় আদালতে আবেদন করেন।
আইনের ঐ ধারায় বলা হয়েছে, “তদন্তকারী সংস্থার লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্পত্তি বা অপরাধলব্ধ আয় বা সম্পত্তি অবরুদ্ধকরণ বা ক্রোক করার আদেশ প্রদান করতে পারবে। ঐ ধারার ৫ উপধারা (৬) এর বিধান সাপেক্ষে, এই ধারার অধীন কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি অবরুদ্ধকরণ বা ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলে আদেশ কার্যকর থাকাকালে উক্ত সম্পত্তি কোনোভাবে বা প্রকারে অন্যত্র হস্তান্তর, উক্ত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রকার লেনদেন বা উক্ত সম্পত্তি কোনোভাবে দায়মুক্ত করা যাবে না। তদন্ত কর্মকর্তার ঐ আবেদন গ্রহণ করে রুবেল ও বরকতের উল্লিখিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেয় আদালত।
গত বছরের ৭ জুন রাতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলার মামলার আসামি হিসেবে শহরের বদরপুরসহ বিভিন্ন মহল্লায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ সাজ্জাদ হোসেন, তার ভাই ইমতিয়াজ হাসানসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। এর আগে রাজবাড়ীতে ১৯৯৪ সালের ২০ নভেম্বর এক আইনজীবী খুন হন। সে হত্যা মামলার আসামি ছিলেন এই দুই ভাই। এসব মামলার তদন্তে গিয়ে এই দুই ভাইয়ের অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের সন্ধান পায় সিআইডি। পরে এই মামলায় তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নেয়া হয় রিমান্ডে। রিমান্ডে থেকে পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। সেখানে ২ হাজার কোটি টাকা কীভাবে বিদেশে পাচার করেছেন এবং এর সুবিধাভোগী কারা তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন এই দুই ভাই। এছাড়া এসব অর্থ কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় অর্জন করেছেন তাদের নামও প্রকাশ করেন তারা। এরপরই ঐ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদের নাম আসে তাদেরই গ্রেফতার করে সিআইডি। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন—জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীম, শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম খন্দকার লেভী ও জেলা শ্রমিক লীগের অর্থ সম্পাদক বেল্লাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এদের অনেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
জামিন প্রশ্নে রুল বিচারাধীন: অর্থ পাচার মামলায় রুবেল ও বরকতকে কেন জামিন দেওয়া হবে না মর্মে জারিকৃত রুল হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ জামিন প্রশ্নে রুল জারি করে। এখন ঐ রুল বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া এই মামলার তিন আসামি এরই মধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। জামিন পাওয়া আসামিদের কারো দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেই।
