পিলখানা হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি

চোখের পানিতে নিহতদের স্মরণ

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৫০

১২ বছরের শিশু সাদাকাত সাবরিন মমিন। তার জন্মের ঠিক ১১ দিন পর বিডিআর হত্যাকাণ্ডে শহিদ হন বাবা মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকার। বাবা কেমন হয় তা তার অজানা। শুধু মায়ের মুখে বাবার নামটি শুনেছেন। আর এ নাম শুনেই বড় হচ্ছে সে। জন্মদাতাকে চোখে না দেখলেও পরম ভালোবাসা কাজ করে তার জন্য। তাই তো বাবার মৃত্যুর একযুগ পূর্তিতে কবরে শ্রদ্ধা জানাতে স্বজনদের সঙ্গে ছুটে আসে সাদাকাত। বাবার আচার- আচরণ ও তার পছন্দের গল্পগুলো এখন মায়ের মুখে শুনে সে। কল্পনায় তাকে হয়ত খোঁজার চেষ্টাও করে সাদাকাত। বাবাকে না দেখার কষ্টটা যেনো ফুটে ওঠে তার প্রতি বাক্যে। মায়ের হাত ধরে বাবার কবরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল—আমি তো বাবাকে দেখিনি। তবে তার কথাগুলো নানু ও আম্মুর কাছে শুনেছি। শহিদ মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকারের স্ত্রীর চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু কান্নার কোনো শব্দ নেই। শুধু দোয়া মোনাজাত শেষে নীরবে চোখ মুছতে মুছতে সন্তানকে নিয়ে কবরস্থান ত্যাগ করেন তিনি। একইভাবে গতকাল বনানী সামরিক কবরস্থানে বাবার কবরে ফুল দিতে আসেন পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত কর্নেল কুদরত এলাহি রহমান শফিকের ছেলে সাকিব রহমান। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ঘটনার ১২ বছর পর হত্যা মামলার রায় নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, এই হত্যার বিচার চূড়ান্ত ধাপে কিন্তু হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো বিচারের বাইরে রয়েছে। আমার দাবি, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। তাহলে ষড়যন্ত্রকারী কারা এবং পর্দার আড়ালে কারা ছিল সেসব বেরিয়ে আসবে।

সকাল ৯টার দিকে বনানীতে সামরিক কবরস্থানে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রাষ্ট্রপতির পক্ষে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহ উদ্দিন ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম আবু আশরাফ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে শহিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শহিদ সেনা সদস্যদের সম্মানে স্যালুট প্রদান করেন। পরে শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। তাদের কান্নায় অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহত কর্নেল কুদরত এলাহি রহমান শফিকের ৮৩ বছর বয়সি বৃদ্ধ বাবা হাবিবুর রহমানও বনানী কবরস্থানে এসেছিলেন। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেকটাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। হাবিবুর রহমান বলেন, ২৫ বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। ছেলে মারা গেছে ২০০৯ সালে। ১২ বছর চলে গেল, এখনো বিচারের রায় কার্যকর হলো না? নিহত লে. কর্নেল লুত্ফর রহমানের ভাই আখলাকুর রহমান ও এহতেশাম রহমান বলেন, তারা চান, এই দিনকে রাষ্ট্রীয় শোক ও ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হোক। তাহলে আগামী প্রজন্ম বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারবে। মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামানের ভায়রা আসলাম সেরনিয়াবাত বলেন, রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। তাহলেই নিহত সেনা কর্মকর্তাদের আত্মা শান্তি পাবে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের একযুগ পূর্তিতে বনানী সামরিক কবরস্থানে শহিদ সেনা অফিসারদের কবরে পুষ্পমাল্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকনের নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)।