খননের দেড় বছরেই ভরাট হয়ে গেছে

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:২২

ভদ্রা ও শালতা নদী

এনামুল হক, খুলনা অফিস

খননের পর মাত্র দেড় বছরের মাথায় ভরাট হয়ে গেছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা ও শালতা নদী। নদী দুটির দুই পাড়ে উঁচু করা অসমতল জমিতে জন্ম নিয়েছে সরু উঁচু উঁচু বৃক্ষ। বৃক্ষরাজির ফাঁকে ফাঁকে দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে আধাপাকা ও টিন-ছনের ঘরবাড়ি। নদীর মাঝখানে পানি শূন্য শুষ্ক সমতল ভূমিতে জন্মেছে সবুজ ঘাস আর লতাগুল্ম। ঘাসখেতে ভিড় করছে আশপাশের বাড়ির গরু-ছাগল। সুবিধাজনক জায়গায় পথ বানিয়ে যাতায়াত করছেন লোকজন। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খননের উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাত্র ১৫ বছর আগেও ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা ও শালতা নদী ঘিরে হাজার হাজার মানুষ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত। জোয়ার-ভাটা, মাছ শিকার ও নৌযান চলাচল ছিল নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ছিল নদী দুটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মুখে ভদ্রা ও শালতা নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার পলি পড়ে নাব্য হারিয়ে ভরাট হয়ে যায়। এছাড়া ভরাটের সঙ্গে সঙ্গে নদীর বুক জুড়ে শুরু হয় অবৈধ দখল। দখলবাজ চক্র ভরাট হওয়া জমিতে গড়ে তোলে বসতবাড়ি, রাইস মিল, স মিল, বাজার, বহুতল ভবনসহ নানা স্থাপনা। ফলে ঐ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় করুণ পরিণতির সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৫ সালে নদী দুটি খননের উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু নানা জটিলতায় প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে লাল ফিতায় বন্দি হয়ে পড়ে। ফের উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ঐ নদী দুটি খননের জন্য ডিপিপি জমা দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাই করে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার। এরপর গত ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একনেকের বৈঠকে ৭৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। যার বাস্তবায়ন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর।

সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে ৯টি প্যাকেজে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কাজগুলো পেয়ে তা বাস্তবায়ন করে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজাইন ও এস্টিমেট অনুযায়ী ভদ্রা নদীর দক্ষিণ অংশের দিঘলিয়া থেকে ডুমুরিয়া বাজার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার ও উত্তরাংশের তেলিগাতি হতে ডুমুরিয়া বাজার পর্যন্ত ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার খনন করে। এছাড়া সালতা নদীটি ডুমুরিয়া বাজারের ভদ্রা নদী থেকে শুরু হয়ে ৯ কিলোমিটার খনন করে শৈলমারি নদীতে সংযুক্ত করে। সোহাগ আহমেদ ও মোক্তার হোসেনসহ এলাকাবাসীর অভিযোগ, এস্টিমেট অনুযায়ী নদীর প্রস্থ ১২০ ফুট এবং গভীরতা ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত খননের কথা ছিল। কিন্তু সব জায়গায় এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া মাটি উত্তোলন করে দুই পাশে রেখে দেওয়া হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর দুই পাশের উঁচু করে রাখা ঐ মাটি ধুয়ে ফের নদীতে এসে পড়েছে। তাছাড়া প্রকল্পের অন্যতম অঙ্গ দিঘলিয়া ও তেলিগাতি প্রান্তে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি স্লুইসগেট নির্মাণের কথা থাকলেও ঐ দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ না করেই কাজ সমাপ্ত করা হয়। ফলে ঐ টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত যায়। অন্যদিকে দুই প্রান্তের বাঁধ কেটে দেওয়ায় জোয়ার-ভাটায় মাত্র দেড় বছরই পলিতে নদী ফের ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদী খননের ব্যয় হওয়া পুরো টাকা পানিতে ভেস্তে গেছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, খর্নিয়ার তেলিগাতি ও টিয়াবুনিয়া বাঁধ কেটে দেওয়াতে পানির সঙ্গে পলি এসে নদী ভরাট করে ফেলেছে। যার কারণে ঐ বাঁধ ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঐ কমিটি স্ট্যাডি করছে। স্ট্যাডিতে সমাধান বের হয়ে আসবে।