জুলফিকার বকুল
সমাজের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ ও নাগরিক অধিকার বজায় থাকে। সমাজজীবনে সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। আর শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষালয়, যেখানে শিক্ষার্থী তার চরিত্র গঠন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ পায়। একটি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক প্রকৃতি, অনুরাগ ও রুচি অনুযায়ী জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। মহত্ এই গুরুদায়িত্বটি একজন আদর্শ শিক্ষক পালন করে থাকেন। শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।
বিশ্বাস একটি বিমূর্ত ধারণা। জন্মলগ্ন থেকে একটি শিশু যা দেখে, শোনে, বোঝে এবং যা থেকে তার ধারণা সৃষ্টি হয় তা থেকেই তার আদর্শ গড়ে ওঠে। আর আদর্শ তাকে বিশ্বাস গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা, নীতিবোধ, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহ্যগত এবং যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি জড়িত। বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে মূল্যবোধের কাঠামো। আধুনিক ধারণা অনুযায়ী মূল্যবোধ হলো কতগুলো জৈব মানসিক সংগঠনের এমন এক সমন্বয়, যা ব্যক্তির মধ্যে উপযুক্ত আচরণ সৃষ্টি করে।
শিক্ষার সংজ্ঞাতে বলা হচ্ছে, আচরণের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী পরিবর্তনের কথা। তাহলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানব সম্পদ সৃষ্টি করা। এমন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার স্বপ্ন ও অধিকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝেই সুপ্ত হয়ে বিরাজ করছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে তা বিকশিত হতে পারে না। অনেকের সুপ্ত প্রতিভা প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সাপোর্টের অভাবে অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের দায়িত্ব হলো অঙ্কুরিত অনুচারাকে অনুকূল পরিবেশ দিয়ে একটি সম্ভাবনাময় বৃক্ষে পরিণত করা। একজন শিক্ষার্থীর ওপর আগামী দিনের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আসবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই তাকে মেধাবী করে তোলার অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ব আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না।
শিক্ষকের উদারতা, মহানুভবতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীর অন্তরে লালিত প্রত্যাশার অঙ্কুরোদগম ঘটায়। শিক্ষার্থীর এই প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষক তার মাঝে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। আর এই দায়িত্ব যথাযথ ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষকের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা, সুষ্ঠু পরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষক এই সমাজেরই কোনো পরিবারের সদস্য। তাঁরও একটি পরিবার আছে। তাই মহান দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত মানুষগুলোর প্রতি সরকারেরও দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। যাতে করে শিক্ষক তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিজেকে কেবল শিক্ষার্থীর মাঝে আবিষ্কার করার অনুসন্ধান করেন। একজন শিক্ষক নিত্য মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখবেন এবং শিক্ষার্থীকে তার স্বরূপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।
একজন মানুষ যখন তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন তার দ্বারা এমন কোনো হীন কাজ নেই যা করা অসম্ভব হয়। তাই শিক্ষার মাধ্যমেই রুচিশীল, দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণময় চিন্তাশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু অর্থ উপার্জনকেন্দ্রিক, তাহলে সমাজে মানুষ তৈরি হবে না, তৈরি হবে মানুষের মতো দেখতে অর্থ প্রত্যাশী অবয়ব—যার অন্তরে অর্থ উপার্জনের নানা কৌশল নিয়ে গবেষণা চলবে অবিরত। ফলে যে কোনোভাবে অর্থপ্রাপ্তির কামনায় দুর্নীতিসহ মিথ্যের আশ্রয়ে নিজেকে লাভবান করার প্রয়াস সৃষ্টি করবে। প্রকৃতপক্ষে সে অভিশপ্ত জীবনের গ্লানি নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। বেঁচে থাকতে অর্থের প্রয়োজন আছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপরিমেয় না হয়। জীবনের সময় খুবই স্বল্প। মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাটাই শ্রেয়। তাই শিক্ষা অর্জন হোক আত্মচেতনা উন্মোচনের একমাত্র নির্ধারিত পথ। আর শিক্ষক হোক তার প্রেরণাকারী পথপ্রদর্শক।
গাজীপুর
