মহাবিশ্বের পরিণতি

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:৩০

মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লুবার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

 

নীলকান্তবাবু আজ অফিস থেকে ফিরে বললেন- চেষ্টা করেছি পানিফল আনতে। কিন্তু সেই ফেরিওয়ালাকে পাওয়া গেল না। আসার পথে রাস্তায় খুঁজেছি। কোথাও পেলাম না। কমলার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বললেন, ধরো।

কমলা প্যাকেট হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকে হেসে ফেললেন। বললেন সিংড়ার বদলে সিঙ্গাড়া নিয়ে এলে। ভালোই হয়েছে। গতকাল সিংড়া খেয়েছি আজ সিঙ্গাড়া খাওয়াই ভালো। প্রত্যেকদিন একই জিনিস খেতে ভালো লাগবে না।

এর মধ্যে বিন্দু দৌড়ে এলো। সেদিনের ফুলানো বেলুনটা সূতা দিয়ে বেঁধে পড়ার টেবিলের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছিল। এর মাঝে আর খেয়াল করেনি। আজ হাতে নিয়ে দেখল অনেকখানি বাতাস বেরিয়ে গিয়ে চুপসে গেছে। বেলুনের গায়ে যে ফোঁটা ফোঁটা এঁকে দেয়া হয়েছিল সেগুলো কাছাকাছি চলে এসেছে। এগুলো দেখিয়ে বিন্দু বলল-বাবা মহাবিশ্ব যেভাবে প্রসারিত হয়, এর উল্টো ঘটনা যদি ঘটে? যদি বেলুনের গায়ে আঁঁকা ফোঁটার মতো গ্রহনক্ষত্রগুলো কাছে চলে আসে?

কমলা বললেন-এখন যা তোরা, তোর বাবা অফিস থেকে এসেছে, একটু ফ্রেশ হয়ে নিক।

বিন্দু বলল, ও আচ্ছা, স্যরি বাবা, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি পরে আসব।

নীলকান্তবাবু বললেন-নানা, ঠিক আছে, আমি পরে ফ্রেশ হবো।

কমলা বললেন-না না, একট ুপরে আসিস।

বিন্দু দৌড়ে চলে গেল আবার। নীলকান্তবাবু ফ্রেশ হয়ে বিন্দুকে ডাকলেন। বিন্দুর সাথে সবাই চলে এলো। কমলা একটা ট্রেতে করে সিঙ্গাড়া এনে দিয়ে বললেন-এবার গল গুজমাও।

বিন্দু বলল- বাবা মহাবিশ্ব যেভাবে প্রসারিত হচ্ছে, যদি উল্টো ঘটে?

নীলকান্তবাবু বললেন- হ্যাঁ, তাহলে মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে জানতে হবে।

সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে শুরু করল। মহাবিশ্বের পরিণতি আবার কী?

মহাবিশ্বের গড় ঘনত্বের সাথে এর প্রসারণ বেগ এর সম্পর্কের ওপর এর ভবিষ্যত্ নির্ভর করে। সমপ্রসারণশীল মহাবিশ্বের প্রসারণকে থামিয়ে দিয়ে আয়ত্বে  রাখার জন্য যে ঘনত্ব থাকা দরকার, তাকে বলা হয় সংকট ঘনত্ব বা সন্ধি ঘনত্ব। ওর ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানী ফ্রিডম্যান মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে তিন ধরনের ভবিষ্যত্ কল্পনা করেন। বদ্ধ মহাবিশ্ব, মুক্ত মহাবিশ্ব এবং সমতল মহাবিশ্ব।

মহাবিশ্বের গড় ঘনত্ব সংকটঘনত্ব অপেক্ষা বেশি হলে মহাকর্ষ বল বেশি হবে এবং প্রসারণ বলকে হারিয়ে দেবে। ফলে মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে আবার আদি বিন্দুতে ফিরে যাবে। এই মহাবিশ্বকে বলা হয় বদ্ধ মহাবিশ্ব। আর যদি গড় ঘনত্ব সংকট ঘনত্ব থেকে কম হয়, তখন মহাকর্ষ বল মহাবিশ্বের প্রসারণকে থামাতে পারবে না। তখন অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হতে থাকবে আমাদের এই মহাবিশ্ব। প্রসারণ একট ুধীরগতির হবে এই যা। এই মহাবিশ্বকে বলা হয় মুক্ত মহাবিশ্ব।

আর গড় ঘনত্ব সংকট ঘনত্বের সমান হলে আকর্ষণ বল প্রসারণ বলের কাছে অল্পের জন্য হেরে যাবে। ফলে প্রসারণ একদম বন্ধ হয়ে যাবে না। শুধু ধীরগতিতে চলবে, তবে প্রসারিত হতেই থাকবে। ধাবমান বস্তুপিণ্ড সোজাপথে চলতে থাকবে। সেক্ষেত্রে স্থান হয়ে যাবে অসীম, সমতল এবং বক্রতাবিহীন। এই মহাবিশ্বকে বলা হবে সমতল মহাবিশ্ব।

আকাশ বলল-কিন্তু মুক্ত, বদ্ধ এবং সমতল এই তিনটার মধ্যে কোন ঘটনা ঘটবে আমরা কীভাবে বুঝব?

যে কোনও একটা ঘটতে পারে, বললেন নীলকান্তবাবু। মহাবিশ্বের গড় ঘনত্ব সংকট ঘনত্বের চেয়ে কম বা সমানও যদি হয়, তখন নতুন নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির আর সুযোগ থাকবে না। পুরনো নক্ষত্রগুলোই বামন নক্ষত্র অথবা নিউট্রন নক্ষত্র অথবা

ব্ল­্যাকহোল হয়ে যাবে এবং ধীরেধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে।

এরপর একসময় অসীম অন্ধকারে ব্ল্যাকহোলদের নিয়ে শীতল অবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে মহাবিশ্ব। পরম শূন্য তাপমাত্রাপ্রাপ্ত হবে এবং এন্ট্রপি চরম অবস্থায় পৌঁছে যাবে। সেখান থেকে সুসংবদ্ধভাবে আর শক্তি বের করা সম্ভব হবে না। একে বলা হবে তাপীয় মৃত্যু (Heat Death)। তখন মহাবিশ্বের সত্যিকারের মৃত্যু ঘটবে।

মহাবিশ্ব মারা যাবে? বলল সীমা। সবাই আঁঁতকে উঠছে মহাবিশ্বের এই পরিণতির কথা ভেবে।

তবে কথা হলো-বললেন নীলকান্তবাবু, বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও অভিকর্ষ এখনও সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেননি। তাই মুক্ত বা বদ্ধ বা সমতল কোনটি হবে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। বদ্ধ মহাবিশ্ব হলে আরও একহাজার কোটি বছর পর সব পদার্থ ও শক্তি ভেঙ্গে চুরে সংহত হয়ে মহাসংকোচন ঘটবে। এই ঘটনার নাম মহাকড়কড় (Big Crunch)!

হেসে উঠল সবাই। নীলকান্তবাবুও হাসলেন। বললেন-তখন, যে অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল, আবার সেই অবস্থায় ফিরে যাবে।

সীমা বলল-তখন কি আবার মহাবিশ্বের সৃষ্টি হবে?

হ্যাঁ, তখন আবার বিগব্যাং হবে, আবার বিগক্রাঁচ, আবার বিগব্যাং।

এভাবে কি চলতেই থাকবে? বলল অণু।

চলতেই থাকবে।

তাহলে এটাই যে প্রথম মহাবিশ্ব, তাতো না-ও হতে পারে, বললেন কমলা। হয়তো এরও আগে আরেকটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, ধ্বংস হয়ে আবার সৃষ্টি হয়েছে।

নীলকান্তবাবু বললেন-তা-ও হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে।

রেখা বলল- তাহলে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

ঠিক বলেছ। বললেন নীলকান্তবাবু। এভাবে প্রকৃতির লীলাখেলা বোঝাটাই কঠিন। মানুষ এই কঠিন কাজটিই করে যাচ্ছে। সত্য আবিষ্কার করছে। রবিঠাকুর তো তাই বলেছেন-সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।

রেখা গান ধরল- একি সত্য সকলি সত্য

হে আমার চিরভক্ত।

গান শেষ হলে নীলকান্তবাবু বললেন-এবারে চা লাগবে।

কমলা বললেন-আনছি।