রাজধানীর কলাবাগানে বহুতল ভবনের নিচে পড়ে বিদেশ পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত কলেজছাত্রীর (১৯) পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো মামলা করা হয়নি। পুলিশ একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগের তীর থাকায় ঐ ভবনের মালিকের ছেলে ফাইজারকে খুঁজছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক বলছেন, প্রাথমিকভাবে ঐ ছাত্রীর শরীরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন বা যৌন হয়রানির কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, মৃতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আর অভিযোগের তীর থাকায় ঐ ভবন মালিকের ছেলে ফাইজারকে আটকের চেষ্টা চলছে। ভিকটিমের পরিবার এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তে গতি মিলবে। পাশাপাশি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিতোষ চন্দ্র বলেন, নিহত ছাত্রীর পরিবার গতকাল শনিবার রাত ৭টা পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তারা একটু দেরিতে অভিযোগ দায়ের করবে বলে শুক্রবার রাতেই আমাদের জানিয়েছে। অভিযোগ দায়ের করার পরই আমরা মামলা নেব।
নিহত ছাত্রীর বাবা জানান, তাদের বাড়ি টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের ঘাটানদি গ্রামে। তারা সপরিবারে মালয়েশিয়াতে থাকতেন। করোনা প্রাদুর্ভাবের পরে তারা ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর থেকে কলাবাগান ৮ নম্বর রোডের, ২ নম্বরে একটি সাততলা বাসার ৪র্থ তলাতে থাকেন। মালয়েশিয়ার এশিয়ান প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ২য় বর্ষে পড়তেন ঐ ছাত্রী। গত বছরের ১৮ জুলাই সেখান থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। ঢাকায় ফেরার পর থেকে অনলাইনে ক্লাস করতেন।
নিহত ছাত্রীর বাবা অভিযোগ করেন, কলাবাগানের ঐ বাড়ির মালিকের ছেলে ফাইজার তাকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করত। ফাইজারের বন্ধু আদনানও তার সঙ্গে মিলে তাকে উত্ত্যক্ত করত। বাসার বাড়িওয়ালার একটিই ছেলে। সে বাইরে থেকে বিভিন্ন ছেলেদের বাসায় নিয়ে আসত। গত সপ্তাহে নিহত ছাত্রীর মা ফাইজারের মাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে তিনি উলটা প্রতিক্রিয়া করেছেন নিহত ছাত্রীর মায়ের ওপর। তাদের অভিযোগ ফাইজারের মা তাকে বলেন, ‘আমার ছেলে যা মনে চায় তাই করবে, আপনার মেয়েকে বের হতে না দিলেই তো হয়, আমার ছেলেকে কেন থ্রেট দিতে আসছেন।’
নিহত ছাত্রীর বাবা বলেন, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আমার মেয়ে ছাদে ওঠে। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে শুনি সে পড়ে গেছে ছাদ থেকে। সেখানে আমার বাসার কাজের ছেলেও দেখেছে অনেকে ক্রিকেট খেলছে, হইচই করছে। মেয়েকে আমি ম্যাসেজ দিয়েছিলাম, সে বলল আসছি। এরপর আমি গ্রিন রোডে আমার অফিসে চলে যাই তখন আমার ছোট মেয়ে ফোনে বলে, আব্বু তাড়াতাড়ি গ্রিন লাইফ হাসপাতালে আসো।
নিহত ছাত্রীর ফুপু বলেন, ঘটনার সময় ছাদে ফাইজার ছিল। বিকালে ছাদের দরজা লাগিয়ে দিয়েছিল। আমাদের ধারণা ওকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ওকে উত্ত্যক্ত করছিল।
কলাবাগান থানার ওসি বলেন, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ভবন মালিকের ছেলে ফাইজারের বন্ধু আদনানকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। ফাইজারকেও আটকের চেষ্টা চলছে। সব মিলিয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। অনুসন্ধান শেষে এবং ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে এটি আত্মহত্যা না হত্যাকাণ্ড সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
এদিকে শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ঐ ছাত্রীর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, মৃতদেহ থেকে রক্ত, ভিসেরা ও হাইভেজনাল সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এগুলো পরীক্ষার জন্য হিস্ট্রোপ্যাথলোজিতে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে বলা যাবে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না। তার শরীরে ধস্তাধস্তির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তার শরীরে যেই আঘাতগুলো রয়েছে তা ভবন থেকে পড়ার কারণেই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
