চলচ্চিত্রে ব্যবসাসফল ও অভিজ্ঞ নির্মাতারা কেন ছবি করছেন না !

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২১, ২০:৪৩

এফডিসির সবগুলো ফ্লোরে টানা কয়েকটা দিন সিনেমার বুকিং ছিল কবে তা কেউ বলতে পারে না। বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অবস্থান ও ভবিষ্যত নিয়েও কেউ সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারে না। কেউ কেউ বলছেন সিনেমার পট পরিবর্তন হবে। সামনের দিনগুলো সুখের। কিন্তু সেই সুখের ধারাবাহিকতায় সিনিয়র নির্মাতারা কী সন্তুষ্ট থাকতে পারছেন? এক সময় ছবিগুলো ব্যবসাসফলতার যুক্তিতে থাকত বরেণ্য চিত্রনির্মাতাদের নাম।

এদিকে সম্প্রতি একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত নির্মাতা সৃজিত মুখার্জী এদেশীয় চলচ্চিত্র সংকট নিয়ে বললেন, ‘পুরো সমন্বয়টার অভাব। হয়ত ভাল গল্প আছে। কিন্তু সেটা বানাতে ১ কোটি টাকা লাগবে। তার কাছে সেই লগ্নিকারক নেই। ফলে দারুণ সেই গল্পটা মার খেয়ে যাচ্ছে। ঠিক একই ভাবে যার টাকা আছে সে হয়ত ভাল গল্প নিয়ে অতটা ভাবছেন না। আবার কেউ ভাল বানাচ্ছেন সবমিলিয়ে কিন্তু লগ্নি উঠে আসছেন না। ফলে হঠাত্ হঠাত্ মনপুরা, আয়নাবাজি বা দেবীর মতো ছবি নিয়ে আলোচনা হয়। এই সাফল্যেও ধারাবাহিকতা থাকে না।’

এদিকে চলচ্চিত্রে সফলতার পেছনের কারিগর পরিচালকদের কাছ থেকেও হাতছাড়া হয়ে গেছে গোটা ইন্ডাস্ট্রি। একসময় গুণী নির্মাতারা প্রযোজকদেও শিডিউল দিতে পারতেন না। সময়ের পরিক্রমায় সেই সোনালি দিন ইতিহাস হতে চলেছে। গুণী পরিচালকরা অনেকেই চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

এটা কী মুখ ফিরিয়ে নেয়া নাকি, তাদেরকে প্রকৃত অর্থে ব্যবহারের কোনো ইন্ডাস্ট্রি দিতে পারেনি সেটিও একটা বড় প্রশ্ন। কারণ পরিচালনা ছেড়ে কেউ ঝুঁকছেন অভিনয়ে, কেউ অন্য পেশায়। তাদের স্থান দখল করেছে মেধাহীন মৌসুমী নির্মাতারা। কিন্তু কেন এই সৃষ্টিশীল নির্মাতারা আড়ালে থেকে চলচ্চিত্রের অপমৃত্যু প্রত্যক্ষ করছেন? এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াত্ বলেন, ‘চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেছি এমন নয়। হয়ত আগের মতো ক্যামেরার পেছনে দাঁড়াচ্ছি না, তবে নিয়মিত অভিনয় করছি। সিনেমা কিন্তু একটা মেধাভিত্তিক মাধ্যম। এখানে মেধা দিয়েই সৃষ্টি করতে হবে। না হলে ঠিক ঝরে যাবে।’

তবে সিনিয়র পরিচালকদের সংস্পর্শ বা সহযোগিতা পেলে নিজেদের মেধাকে শানিত করতে পারে নতুন প্রজন্মের নির্মাতা-শিল্পীরা। তাদের দূরে সরে যাওয়া চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে মেধা সংকট তৈরি করছে কি-না এমন প্রশ্নে নির্মাতা ড. মতিন রহমান বলেন, ‘দেখুন, সবাই তো চিরদিন একই জায়গায় থাকবে না। কোনো না কোনো সময় তাকে সরে যেতে হবে। সেই জায়গায় নতুন করে হাল ধরবে তরুণ প্রজন্ম। তাদের নিজেদের ভেতরে ভালো কাজ করার চেষ্টা থাকতে হবে। পরিশ্রম করে কাজ করলে ভালো ছবি তারাও নির্মাণ করতে পারবে। তবে আমাদের ভেতরে সৃষ্টিশীল কাজ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল, যেটা এখনকার অনেকের মাঝেই নেই।’

শুধু পরিচালকের অভাব নয়, দেশের ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন ধরেই ভালো প্রযোজক সংকটে রয়েছে। এটাও ভালো পরিচালকদের সরে যাওয়ার আরেকটি কারণ। মৌসুমী যেসকল প্রযোজক ছবি নির্মাণে আসেন তারা মূলত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কথা মাথায় রেখেই ছবিতে লগ্নি করে। এ নিয়ে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘আমরা চলচ্চিত্র দূরে সরে যাইনি। আসলে আমরা যে ধরনের গল্পে ছবি নির্মাণ করতে চাই সেই ধরনের গল্পে লগ্নি করার মতো প্রযোজকের এখন বড় অভাব। এখনকার প্রযোজকরা আমাদের গল্পে কাজ করার জন্য প্রস্তুত নন।’

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করা অসংখ্য পরিচালকের নিজেস্ব টিম তৈরি হওয়ার উদাহরণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে লক্ষ্য করা যায়। সেদিক থেকেও আমাদের দেশের পরিচালকরা পিছিয়ে আছেন। এটাও হয়তো দেশের চলচ্চিত্রের জন্য অনেক বড় একটা সংকট। এছাড়া চলচ্চিত্র সংগঠনগুলোতে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য একে অন্যকে বয়কট করার প্রবণতাও চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ বলে মনে করেন এই প্রখ্যাত নির্মাতারা। 

এদিকে প্রতিটি দেশের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিই সংগঠনের বাইরে মূলত অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় সমকালীন সুপারস্টারের ভাবনায় বা কার্যকারিতায়। বছর দুয়েক আগে শাকিব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন সিনিয়র নির্মাতাদের সাথে নিয়মিত কাজ করবেন। তরুন নির্মাতাদের পাশাপাশি সিনিয়র নির্মাতাদের নিয়েও নিয়মিত ছবি রিলিজ দেবেন। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা টেকেনি নানান কারণে।

এদিকে বয়সের সাথে সাথে বাইরের দেশের নির্মাতাদের বলা হয়, তারা অভিজ্ঞ হয়েছেন। আর আমাদের এখানে আলোচ্য হয়, তারা বুড়িয়ে গেছেন। দৃষ্টিভঙ্গি আর ব্যবহারের প্রয়োগে তাই আকাশ পাতাল পার্থক্য। অথচ যশ চোপড়া তার মৃত্যুর কয়েকমাস আগেও শাহরুখ ক্যাটরিনাকে নিয়ে ছবি করেছেন। আদতে সিনিয়র নির্মাতারাও স্ব স্ব ব্যানারে আলাদা নির্মানদল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে আজ যখন সিনিয়র নির্মাতার ভীষণ ম্যাচিউরড হয়ে দারুণ কিছু কাজ দেবেন ভাবছেন, তখন তাদের কেউ কেউ ইউটিউবার হচ্ছেন, কেউ অভিনয়ে ব্যস্ত থাকছেন, কেউ নাটক নির্মান করছেন, কেউবা চলচ্চিত্র বিষয়ক শিক্ষকতায় নিজের যাপিত সময়ের আনন্দ গুনছেন।