নদী ভর্তি বোয়ালমাছ। ছিপ ফেললেও বোয়ালমাছ। জাল ফেললেও বোয়ালমাছ। গ্রামটা যেন বোয়ালমাছে ভরা। ভালোই লাগে অনু-বিনুর। বোয়ালমাছ খেতেও খারাপ লাগে না। উঠোনে আছে বেগুন আর কাঁচামরিচ। অনুদের প্রিয় তরকারি। রান্নাও তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।
রাত্রে আসে মুক্তিযোদ্ধারা। এসেই বলে, সখিনা খালা ভাত খাব। অনু-বিনুর মা সখিনা একটুও দেরি করে না। চুলার কাছে যায়। চালে-ডালে খিচুড়ি রান্না হয়। আর ডিম ভাজা। জয়নুল ভাই-আহাদ ভাইরা মজা করে খায়। আহাদ ভাইদের কাছে কত রকমের যে অস্ত্র আছে তা বলে বোঝাতে পারবে না অনু বিনু।
বিনু জিগেস করে, আহাদ ভাই এত ভারী অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করো কেমন করে?
আহাদ ভাইরা হাসে—বুঝলি অনু বিনু ট্রেনিং নিতে হয়েছে।
অনু বিনু হাসে—জানি। তোমরা তো বড় মুক্তিযোদ্ধা। আমরা জানি, একদিন তোমরা দেশটাকে স্বাধীন করবে। আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। আমরা পাব বাংলাদেশ।
ঠিক বলেছিস অনু বিনু।
পাড়ার আরো মেয়েরা আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ধরে সবাই। সখিনা খালা হাসে। খুব আনন্দ পায় সখিনা খালা। অনুরা খিলখিল করে হাসে।
ফরহাদরা আজ একটু বেশি রাত করে এলো। তিনজনকে দেখতে না পেয়ে চমকে ওঠে খালা—মিজান, জুলফিকার আর জয়নুল কই রে?
ওদের কণ্ঠ কান্নাজড়িত, খালা ওদের বাঁচাতে পারলাম না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ওরা দেখতে পাবে না।
তাড়াতাড়ি খেয়ে চলে যায় ওরা। চারদিকে বিপদের হাতছানি। নিকষ কালো অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে। ডাহুক ডকে করুণ সুরে। সখিনা খালার চোখ ছলছল করে ওঠে।
এর মধ্যে সাতদিন পার হয়ে গেছে। সখিনা খালা রাতে আফজালদের বাড়ি যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতে। আশা জাগে মনে। স্বপ্ন দেখে ভাঙা ঘরে বসে। স্বাধীনতা আসতে খুব বেশি দেরি নেই। বাংলার দামাল ছেলেরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ করছে প্রাণপণে। রাতে আসে আহাদরা। ওদের আজ খুশি খুশি লাগে। আহাদরা সংখ্যায় আজ অনেক বেশি। সাহস আর শক্তিতে সবাই যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ ঠেকাতে পারবে না।
