নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হইবার পর কী করিয়া একটি সেতু ভাঙিয়া পড়িতে পারে? গত রবিবার রাতে পাগলা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের কোন্দানালা এলাকায় নির্মাণাধীন সেতুটির পাঁচটি গার্ডার ধসিয়া পড়ে। সেতুটি ধসিয়া পড়িবার নেপথ্যে ঠিকাদারের নিম্নমানের কাজকেই দায়ী করিতেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ। সেতুটির গার্ডার ভাঙিয়া এই দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ভবনের ক্ষেত্রে যেমন বিম, সেতুর জন্য তেমনি গার্ডার। সেতুর উপর দিয়া গাড়ি বা অন্যান্য পরিবহনের ভার বা লোড সামাল দেওয়াই গার্ডারের কাজ। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কলামের উপর বিম বসানো হয় আর গার্ডার বসানো হয় পিলারের উপর। পিলার ও স্ল্যাবের মধ্যিখানে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য এই গার্ডার বসানো হয়। মূলত ভার্টিক্যাল লোড লইবার জন্য গার্ডার ব্যবহার করা হয়। পত্রিকান্তরে এমনও অভিযোগ আমরা দেখিয়াছি যে, ভাঙিয়া পড়া সেতুটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহিত সওজ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভালো সম্পর্ক রহিয়াছে, ফলে ঐ কাজে যথাযথ তদারকি হয় নাই। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ইহাকে স্রেফ দুর্ঘটনা বলিতে চাহিতেছেন।
তবে এই ক্ষেত্রে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘শিয়াল পণ্ডিত’ গল্পটি বেশ প্রাসঙ্গিক হইতে পারে। গল্পটি সংক্ষেপে এইরূপ যে—শিয়াল বড্ড চালাক দেখিয়া কুমির ভাবিল, তাহার সাতটি ছেলেকে শিয়ালের নিকট লেখাপড়া শিখাইতে পাঠানো যাউক। কুমিরের বাচ্চাকে পড়ালেখা শিখাইবার দায়িত্ব পাইয়া শিয়ালের জিভ লকলক করিতে থাকে। শিয়াল প্রথম দিন একটি বাচ্চা খাইয়া ফেলিবার পর কুমির আসিয়া খোঁজ লইলে শিয়াল ছয়টি কুমিরের বাচ্চাকে ছয় বার দেখাইল, শেষেরটিকে দেখাইল দুই বার। বোকা কুমির তাহা বুঝিতে না পারিয়া ভাবিল—সাতটাই দেখানো হইয়াছে। এমনি করিয়া শিয়াল রোজ একটি করিয়া কুমিরছানা খাইবার পর শেষে যখন একটি ছানা বাকি রইল—তখন সেই একটিকেই সাত বার দেখিইয়া সে কুমিরকে বুঝাইল। শেষ বাচ্চাটিও খাইবার পর কুমির যখন বুঝিল শিয়াল তাহার সাতটা বাচ্চাই খাইয়া ফেলিয়াছে, খালি তাহার ছানাদের হাড়গুলি পড়িয়া আছে, তখন সে রাগিয়া পলায়নরত শিয়ালকে পাকড়াও করিয়া তাহার পা কামড়াইয়া ধরিল। শিয়াল বলিল, আমার লাঠিগাছা ধরিয়া কে টানাটানি করিতেছে! কুমির ভাবিল, তাই তো! পা ধরিতে গিয়া লাঠি ধরিয়া ফেলিয়াছি! শিগিগর লাঠি ছাড়িয়া পা ধরি! কুমির শিয়ালের পা ছাড়িয়া দিলে অমনি শিয়াল একলাফে পালাইয়া বনের ভিতরে ঢুকিয়া যায়। দেশের পরিস্থিতি সেই শিয়াল-কুমিরের মতোই প্রতীয়মান হইতেছে।
তবে সকল ক্ষেত্রেই শিয়ালরা বনের মধ্যে পালাইতে পারে না। যেমন—একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ জনপ্রতিনিধি একবার দেখিলেন তাহার এলাকায় একটি পাঁচ টন বহন ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক ৪০ টন বোঝা লইয়া বেইলি ব্রিজে উঠিয়াছে। তিনি ঐ ট্রাকটিকে আটক করিবার নির্দেশ দেন। কিন্তু ট্রাকটির মালিক নিম্ন আদালতে মামলা করিয়া উহা মালিকের হেফাজতে রাখিবার আদেশ আদায় করিয়া লয়। কিন্তু ঐ জনপ্রতিনিধিও ছাড়িবার পাত্র নহেন। তিনি হাইকোর্টে গিয়া নিয়ম লঙ্ঘনকারী ঐ ট্রাকটিকে মালিকের হেফাজত হইতে পুনরায় থানার হেফাজতে লইয়া আসেন। সুতরাং জনপ্রতিনিধিরাও যে বিশেষ ভূমিকা রাখিতে পারেন তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
পাগলা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দির ব্রিজটির নির্মাণকাজে তদারকি সঠিক হইলে ভাঙিবার কোনো কারণ থাকিত না। মুশকিল হইল, অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকাদারদের সঙ্গে নজরদারি কর্তৃপক্ষের ডান হাতের কারসাজি থাকে। যাহার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক অনিয়ম দেখিয়াও দেখা হয় না। জানিতে ইচ্ছা করে, প্রকল্প বা ঠিকাদারি কাজ বাস্তবায়নের পিডি, নির্বাহী প্রকোৗশলী, এসও, এমনকি ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পর্যন্ত থাকেন। তাহারা কী করেন? দেশে নিশ্চয়ই আইনকানুন রহিয়াছে। আমাদের সম্পদও বাড়িতেছে। কিন্তু দেখা যাইতেছে বহু ক্ষেত্রেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হইতেছে না। সুতরাং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কী করিলেন—তাহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
