টিকা-রঙ্গ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ২২:০০

করোনা প্রতিষেধক টিকা নিয়ে আমাদের দেশে কত রঙ্গ-তামাশা, কত কথা। অমুক আগে নিক, তমুক পরে নিক। এখন কার আগে কে নেবে তা নিয়ে ধুন্ধুমার লেগে যাবার উপক্রম। আসলে কোভিড-১৯ মহামারির ইতিবৃত্তের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে টিকা নিয়ে দুনিয়া-কাঁপানো মাতামাতি। এ যেন সূর্যের আলোকে মুঠোয় বন্দি করার একুশ শতকের অভীক্ষা। এক মারণ-ভাইরাস দুনিয়াটাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে খোলসের মধ্যে, আর অভূতপূর্ব তত্পরতায় তৈরি হয়েছে কোভিড-১৯ প্রতিরোধক টিকা বা ভ্যাকসিন। এর মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণপ্রয়োগ শুরু হয়েছে ‘ফাইজার ভ্যাকসিন’, ‘মডার্না ভ্যাকসিন’, ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন।’

সাধারণভাবে টিকা আবিষ্কারের সময়সীমা অনিশ্চিত হলেও বা টিকা তৈরিতে ১০-২০ বছর লাগলেও, কোভিড-১৯ হলো এক নজিরবিহীন প্রতিযোগিতার নাম। বছর ঘোরার আগেই এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ না হতেই টিকা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে দুনিয়া জুড়ে এক অভাবনীয় তাড়না। দুনিয়াবাসী ভাবতে শিখেছে, অতিমারি-বিধ্বস্ত দুনিয়াতে কোভিডের টিকাই স্বাভাবিক জীবনে ঢোকার ‘চিচিং ফাঁক’ মন্ত্র। এক অতি-আবশ্যক বাধ্যবাধকতা। তাই পৃথিবীর নানা দেশেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি নিয়ম আলগা করেছে কোভিডের টিকার পরীক্ষানিরীক্ষায় বা তার অনুমোদনে। বিভিন্ন কোম্পানির টিকা পরীক্ষাকরণের বয়স কিন্তু মাত্র কয়েক মাস। তাই তাদের সাফল্যের গল্পে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষাকবচ হয়ে ওঠার কোনো আশ্বাসবাণী থাকা সম্ভব নয়, নেইও। টিকার সুরক্ষা কয়েক মাসের মধ্যেই হারিয়ে যাবে কি না, তাও জানা নেই। সাফল্যের শতাংশগুলি স্বল্পমেয়াদেই প্রযুক্ত। তড়িঘড়ি তৈরি হওয়াতে জানা নেই টিকার সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি বা মধ্যমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও। তার পরও শুরু হয়েছে টিকাকরণের বিপুল উত্সব।

আমাদের দেশে ভুল বাক্যে একে-অপরকে বলছেন, আপনি টিকা দিয়েছেন? আমি তো দিয়েছি। আসলে সঠিক বাক্যটি হবে টিকা নেওয়া। যে স্বাস্থ্যকর্মী সিরিঞ্জ দিয়ে টিকা পুশ করছেন, তিনি টিকা দিচ্ছেন। আর আমরা আমজনতা টিকা নিচ্ছি। এমন ভুল বাক্য ব্যবহারের কারণ কী? হতে পারে আমরা একে-অপরকে সারাক্ষণ এত এত উপদেশ দিই, জ্ঞান দিইই, বাঁশ দিই যে আমরা ভুলেই যাই যে, টিকাটা আমি আসলে নিই, দিই না!

যাহোক, টিকাকরণের পাশাপাশি যথারীতি চলছে টীকা-টিপ্পনী। অবশ্য টিকা নিয়ে এমন টিপ্পনী, অবিশ্বাস, গুজব সব সময়ই ছিল। পোলিও টিকা নিয়ে পুরুষত্ব হারানোর ও জন্মনিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল। তা নির্মূলে ধর্মনেতাদের সাহায্য নিতে হয় ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে। হামের প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগের সময় গুজব ছড়িয়েছিল যে, এই টিকায় শূকর-নিঃসৃত কিছু রয়েছে। এর ফলে বহু জায়গায় টিকাকরণ থমকে গিয়েছিল।

কোভিডের প্রতিষেধক নিয়েও নানা খবর ছড়াচ্ছে। মুখমণ্ডল পালটে যাওয়া, পুরুষত্ব হারানো, শরীরের মধ্যে গোপন চিপ ঢুকিয়ে দিয়ে সব তথ্য জেনে নেওয়া, টিকায় শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এটা হারাম—এমন নানা আজগুবি তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এখনো তা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে কুসংস্কার, রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক স্বার্থ, বিজ্ঞানবিমুখতা ইত্যাদি নানা কারণ। আর এসব কারণে করোনার টিকাকারদের গলদঘর্ম হয়েছে। মাথায় রাখতে হয়েছে, কোন টিকা মানবতাবাদী, কোন টিকা পরিবেশবান্ধব, কোন টিকা বাজারবত্সল, কোন টিকা ভোটপ্রদায়ী, কোন টিকা কূটনীতিবাগীশ, কোন টিকা শাস্ত্রসম্মত। গুচ্ছ দেশ গবেষণার মহড়ায়। শেষ পর্যন্ত সব কুল-মান রক্ষা করে তৈরি হয়েছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ টিকা!

এত কিছুর পরও বাংলাদেশে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এক অভূতপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অবাধ টিকা বিতরণ কর্মসূচি চলছে। কোনো রকম তদবির ছাড়া, মামা-চাচা-খালুর জোর ছাড়া, ঘুষ ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া ছাড়া দেশের আপামর সাধারণ মানুষ করোনা ভাইরাসের টিকা পেয়ে যাচ্ছে। টিকা দিতে গিয়ে কেউ কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছে না। গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—কোথাও তেমন কোনো অভিযোগ শোনা যাচ্ছে না। মুখে মাস্ক, বুকে স্যান্ডো গেঞ্জি ও উন্মুক্ত পেশিবাহী সেলফিতে একাকার ফেসবুকের পাতা। মাস্কের কারণে লোকের মুখের হাসি না দেখা গেলেও চোখে ব্যক্ত বা অব্যক্ত কৃতজ্ঞতার ভাষা! এ যেন অচেনা এক বাংলাদেশ! প্রবল সমালোচক খুঁত ধরতে ওস্তাদ মানুষজন কোনো অভিযোগ ছাড়া টিকা নিচ্ছেন, তারপর ফেসবুকে ছবি দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা সত্যিই বিরল!

সরকারের সদিচ্ছায় হোক কিংবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে হোক, এ আয়োজনের প্রশংসা করতেই হয়। সদিচ্ছা থাকলে যে বাংলাদেশেও সরকারিভাবে উন্নত সার্ভিস দেওয়া যায় এটা তার দৃষ্টান্ত। তবে আমাদের এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অন্তত ৭০ ভাগ টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন, করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করার প্রয়োজনে। বর্তমান গতি অর্থাত্ দিনে ২ লাখ হিসেবে দেশের ৭০ ভাগ লোককে টিকা দিতে প্রায় দেড় বছর সময় প্রয়োজন। টিকার ডোজ প্রয়োজন প্রায় ২২ কোটি। কাজেই টিকা প্রদান কর্মসূচি চলাকালেই কীভাবে ক্রমাগত এ কর্মসূচিকে আরো বেশি সম্প্রসারণ করা যায়, কীভাবে টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে কাজ করে যাওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন ভ্যাকসিন নিতে অনিচ্ছুক মানুষদের ব্যাপক হারে প্রচারণা চালিয়ে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী করে তোলা।

বাংলাদেশ টিকাকরণে অত্যন্ত সফল একটি দেশ। ছোটবেলায় আমাদের সবারই টিকা নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। শিশুদের এখন পর্যায়ক্রমে ছয়টি টিকা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে লাখ লাখ শিশুর জীবন রক্ষা পেয়েছে। কোভিড-১৯ যেমন একটি বাস্তবতা, ঠিক তেমনি টিকাও একটি বাস্তবতা। কাজেই টিকা নিয়ে কোনো দ্বিধা নয়। নিজে টিকা নিতে হবে, অন্যকে উত্সাহিত করতে হবে। টিকা নেওয়া শুধু নিজের সুরক্ষার জন্য নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। মনে রাখা প্রয়োজন, সবাই সুরক্ষিত না হলে কেউ সুরক্ষিত নয়। কেবল ব্যাপক হারে টিকা নেওয়া ও করোনার স্বাস্থবিধি মানার মাধ্যমেই সম্ভব আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনা।

মনে রাখা দরকার, ছোটবেলার টিকা দেওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে করোনার টিকার অভিজ্ঞতার কোনো মিল নেই। ছোটবেলায় যখন টিকা দেওয়া হয়েছিল, পালিয়ে গিয়েছিলাম। ধরে এনে টিকা দেওয়া হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। তখন টিকা নেওয়া অনেক কষ্টকর ছিল—ঘা হয়ে যেত, ইনফেকশন হয়ে যেত। সুই নয়, মনে হতো শরীরে যেন একটা আস্ত গজাল ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের অনেকেরই বাঁ হাতে রয়েছে বিসিজি বা ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুউরিন টিকার দাগ। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের শরীরে রয়েছে এই টিকার দাগ যা যক্ষ্মার প্রতিষেধক হিসেবে শৈশবে দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনকার টিকা শরীরে দেওয়ার সময় টেরও পাওয়া যায় না। মশার কামড়ও যতটুকু টের পাওয়া যায়, করোনাটিকায় সেইটুকুও টের পাওয়া যায়। অত্যন্ত সরু একটা সুঁই দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে করোনা প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়।

তার পরও আমাদের দেশে অনেকেরই ইনজেকশন ভীতি আছে। ইনজেকশনের ভয়ে অনেকে ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। গেলেও কিছুতেই ইনজেকশন দিতে চায় না।

‘ইনজেকশন ভয় পায়’ এমন একজন কিশোরগঞ্জবাসীকে একবার জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।

ডাক্তার : আপনার সমস্যা কী?

রোগী : মাতা ব্যাদনা। এই বাই, বালা ওইয়া যায়াম, ইঞ্জিশন লাকত না।

ডাক্তার : আর কোনো সমস্যা?

রোগী : শইল্ল জ্বর। বড়ি খাইলেই বালা ওইয়া যায়াম, ইঞ্জিশন লাকত না।

ডাক্তার : পায়খানা ঠিকমতো হয়? শক্ত না নরম?

রোগী : অয় মানে, কী কইন? মিল্লা মারলে আইন্নের কফাল ফাইট্টা যাইব, এরুম শক্ত! ইঞ্জিশন লাকত না !

পুনশ্চ :করোনা টিকা নিয়ে আমাদের দেশে বকবকানির শেষ নেই। কেউ বলছে করোনার চেয়ে বেশি জরুরি দুর্নীতিবিরোধী টিকা। কেউ বলছেন, শয়তান কীভাবে ভালো হয়, সেই টিকা দরকার। কেউ কেউ আবার বাচাল রাজনীতিবিদদের বাকস্বল্পকরণ টিকার কথা বলছেন।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে স্বনামধন্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি গল্প। মুজতবা আলীর রসবোধ ছিল দুর্দান্ত। তার উপস্থিতিতে মশগুল হয়ে উঠত আড্ডার আসর। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী। কোনো বিষয়ে অনর্গল বলে যেতে পারতেন। এ অসাধারণ বাগ্মিতা কোথায় পেয়েছিলেন তিনি?

সে কথা বলে গেছেন তিনি নিজেই। তার ব্যক্তিগত চিকিত্সক মহম্মদ আবদুল ওয়ালী লিখেছেন, তার সঙ্গে মুজতবা আলীর প্রথম সাক্ষাত্ যখন হয়, তখন টানা তিন দিন তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছিলেন। এরপর মুজতবা আলী নিজেই বলেন, এই যে তিনি এত বকবক করেন, তার জন্য তিনি দায়ী নন। এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে।

উত্সাহ দেখালেন আবদুল ওয়ালী। মুজতবা বলেন, ছেলেবেলায় তিনি যে পাড়ায় থাকতেন, সে পাড়ায় বাচ্চাদের যিনি টিকা দিতেন, তাকে মুজতবার মা বলেছিলেন ছুটির দিনে বাড়ি আসতে।

পরদিন টিকাদানকারী এলেন। মা জানতে চাইলেন, টিকা দেওয়ার সব যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে কি না। টিকাদানকারী বললেন, সিরিঞ্জ আনতে ভুলে গিয়েছেন।

মা বললেন, চিন্তা নেই, ব্যবস্থা আছে। কিছুক্ষণ পরে তিনি হিজ মাস্টার্স ভয়েসের গ্রামোফোনের পিন নিয়ে এলেন! টিকাদানকারীকে বললেন, এই পিন স্পিরিটে পুড়িয়ে টিকা দিয়ে দিন।

মুজতবা আলী ডাক্তারকে বললেন, তাকে যে রেকর্ডপিন দিয়ে টিকা দেওয়া হলো, সেই থেকে তিনি হিজ মাস্টার্স ভয়েসের বিশ্বস্ত সেবকের মতো জীবনভর বকে চলেছেন।

আমাদের দেশে অকারণ বকবক করা মানুষগুলোর অভিজ্ঞতাও কি তবে সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো?

 n লেখক : রম্যরচয়িতা