গুজবকে না বলুন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২১, ২১:২৮

বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত একটি শব্দ হচ্ছে ‘গুজব’। এই শব্দটি ভয়াবহ আকারে এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র। আর গুজব তৈরির কারখানা বলা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে। এখন মানুষ সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যা আসে সেটাই শেয়ার করে দেয়। কোনো রকম বিচারবিশ্লেষণ না করেই তারা সেটা শেয়ার করে দেয়। এর ফলে অনেক সময় অনেক বড় সমস্যা হয়ে যায়। বর্তমানে একটি গুজব ছড়াতে খুব বেশি সময় নেয় না। মুহূর্তের মধ্যে সেটি পুরো দেশে বিস্তার করে ফেলে। মানুষের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময় অনেক স্বার্থান্বেষী মহল এটা করে থাকে। এরফলে যারা না জেনেশুনে এগুলো শেয়ার করে তারা পরবর্তী সময়ে বিপদে পড়ে যায়। এটি এমন এক ধরনের ভাইরাস যেটি মানুষের পুরো ব্যক্তি-ইমেজকে নষ্ট করে দেয়। মানুষ তাকে ভুল বোঝে, সমাজে তার সম্মানহানি ঘটে। আমাদের দেশে এটা প্রায়ই হয়ে থাকে। গাছের মতো গুজবের ডালপালা গজায় খুব দ্রুত। আর সেই গুজব চর্চাকারী যদি বাঙালি হয়, তাহলে ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগে না। আর গুজব নিয়ে প্রাচীনতম গল্পটা হয়তো অনেকেই জানেন। রানিমা মৃত যমজ সন্তান প্রসব করেছেন। গুজবের ডালপালায় ভর করে দূরতম প্রজার কাছে এই সংবাদ এইভাবে পৌঁছাল যে, রানিমা এক জোড়া কালো কাক প্রসব করেছেন! প্রসবের পরপরই ওড়ার চেষ্টা করায় কাক দুইটির মৃত্যু হয়েছে। কালো সেই কাক দেখার জন্য প্রজারা দলে দলে ভিড় জমাতে লাগল রাজমহলের আশপাশে।

কয়েক মাস আগে আসে লবণের গুজব। যারা গুজব ছড়িয়েছেন তারা ভালো করেই জানতেন এখন গুজব ছড়ানোর উর্বর সময়। কারণ, অস্থিরতার মধ্যে মানুষ গুজব বিশ্বাস করে। প্রকৃত তথ্য পেতে এখানে সময় লাগে। অথবা পাওয়া যায় না। আর সেই ফাঁকে যা হওয়ার হয়ে যায়। লবণসংকটের ১২ ঘণ্টার গুজবেও যাদের ব্যবসা তারা কিন্তু ঠিকই করেছেন।

এই লবণের গুজবেরই একটা ইতিবাচক দিকও আছে। আর সেটা হলো—গুজবের বিপরীতে মানুষকে প্রকৃত তথ্য যত দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য ও সংগঠিতভাবে দেওয়া যায়, ততই দ্রুত গুজব পাখা গুটিয়ে পালিয়ে যায়। লবণের গুজবের বিরুদ্ধে এই প্রচেষ্টা ছিল সংগঠিত ও সার্থক। সাধারণ মানুষও এই গুজবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যারা লবণের সরবরাহকারী, তাদেরই গুজবের বিরুদ্ধে মাঠে নামানো ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। একইভাবে ছেলেধরা গুজবের পর ‘হারপিক’ কমোডে ঢেলে মশা মারার গুজব কাজে আসেনি। কারণ, হারপিক প্রস্তুতকারকরাই বলেছেন—এটা মশা মারার জন্য নয়। করোনার ভ্যাকসিন নিয়েও অনেক গুজব ছড়ানো হয়েছে। প্রথমে মানুষ এটাকে নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিতে ছিল। অনেকে অনেক কথা বলেছে। অনেক হাস্যকর বিষয়ও এসেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে—সবাই ঠিকই ভ্যাকসিন নিচ্ছে।

গুজব আর ভুয়া সংবাদ পৃথিবীতে সব সময়ই ছিল; কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এগুলো অন্যমাত্রা অর্জন করেছে। বলা হয়, বর্তমান যুগ সত্য-উত্তর যুগ। এই যুগে সত্যের কোনো বিষয়গত বাস্তবতা নেই; বরং নিজ নিজ মতামত, মতাদর্শ আর মূল্যবোধ দিয়েই মানুষ নিজ নিজ ‘সত্য’ বানিয়ে তোলে। ‘ইকো চেম্বার’ বলে একটা ধারণা চালু আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এটাকে বাংলায় আমরা বলতে পারি ‘একমত সংস্কৃতি’। মানুষ যেসব বিষয়ে একমত, যা পছন্দ করে, সে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিবেশে শুধু সেগুলোই দেখবে এবং শুনবে। এই মনস্তত্ত্বের পালে বাতাস দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও তাদের সার্চ ইঞ্জিন এমনভাবে ডিজাইন করেছে, যেন এ মাধ্যম ব্যবহারকারী সব সময় তার পছন্দমতো বা রুচির বাগানে শুয়ে-বসে থাকতে পারেন। বাইরে যা ঘটুক, তার রুচির বাগানই তার কাছে সত্য হয়ে ধরা দেয়। তার হোমপেজ তারই রুচি অনুযায়ী সাজানো। এটাই ইকো চেম্বার, সত্য-উত্তর যুগের। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রত্যেক মানুষের ইকো চেম্বার তার রুচির বাগান হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত সত্য তৈরি হচ্ছে। গোষ্ঠীগত সত্য তৈরি হচ্ছে। অমুকের সত্যের সঙ্গে তমুকের সত্যের সংঘর্ষ লাগছে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহূত হচ্ছে এর পাদানি হিসেবে।

তবে এই সমস্ত গুজব আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের সবাইকে অনেক সচেতন থাকতে হবে। অনলাইনে বা ফেসবুকে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনোকিছু শেয়ার করার আগে অবশ্যই সেটার সত্যতা বিচার করতে হবে। নিজে গুজবকে পরিহার করতে হবে এবং অন্যকেও উত্সাহিত করতে হবে, যেন সে গুজবের স্বীকার না হয়। কারণ গুজবকে প্রতিহত করতে না পারলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, শান্তি বিনষ্ট হবে। তাই আমাদের সবার স্লোগান হওয়া উচিত, ‘দেশকে ভালোবাসুন, গুজবকে পরিহার করুন’।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়