‘পরিবার’—এই শব্দটিকে আমরা যার যার মতো করে কেউ আবেগমিশ্রিতভাবে আবার কেউবা এক কথায় বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। কেউ কেউ আবার পরিবারের এই মায়ার বন্ধনকে কোনো শব্দে বা বাক্যেই উপাখ্যান করতে পারি না। সাধারণত একটি পরিবারের শুরু হয় একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে। কারণ প্রায় সব ধর্মেই বিয়ে হলো একজন নারী ও পুরুষের একসঙ্গে থাকার ধর্মীয় ও সামাজিক মাধ্যম। বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয়। ভালোবাসা, আবেগ, বোঝাপড়া, সন্তান, বাবা-মা অথবা স্বামী-স্ত্রীর কর্তৃত্বে পরিবার পরিচালিত হয়।
বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ভালোবাসায় যেমন একটি সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার গড়ে ওঠে ঠিক তেমনি তাদের একটু অসতর্কতা বা দায়িত্বহীনতার কারণে প্রতিনিয়ত ভেঙে যায় এমন অনেক পরিবার এবং সেই সঙ্গে অন্ধকার হয়ে যায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা ঐ পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের ভবিষ্যত্। একটি শব্দ ‘বিবাহ বিচ্ছেদ’ শুধু দুটি মানুষকে নয় দুটো পরিবারের মাঝে এমন দেয়াল তুলে দেয় যে, সেই দেয়াল ভেদ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। মাত্র একটা সম্পর্কের ব্যবধানে দুটি পরিবারের প্রত্যেকের মধ্যে হাজার হাজার মাইল সমান সম্পর্কের দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
বিবাহ-পরবর্তীকালে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে থাকাতে দুজনের মধ্যে যে কারোর সমস্যা বা সম্পর্কে টানাপড়েন থাকলে যদি তারা স্ব-ইচ্ছায় সম্পর্কচ্যুত হতে চান তাহলে আমরা তাকে বিবাহবিচ্ছেদ বলে থাকি বা বিবাহবিচ্ছেদ মানে এমনটাই বুঝে থাকি। বিবাহবিচ্ছেদ দুজন বিবাহিত মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়ার খুব সহজ ও সুন্দর সমাধান। কিন্তু এই সহজ ও সুন্দর সমাধানের মধ্যেও জটিল যে ব্যাপার, সেটি হচ্ছে বিয়ে শুধু দুটো মানুষকে এক সূত্র গাঁথে না সঙ্গে দুটো পরিবার ও বিবাহ-পরবর্তী তাদের সন্তান-সন্তানাদি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে।
পরিবারে সন্তান আসার আগে বিবাহবিচ্ছেদ হলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সচ্ছল হলে এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী তেমন কেউই না। কিন্তু সন্তান থাকলে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সেই সন্তান। কারণ, সচ্ছলতা ছাড়াও আমাদের সমাজে ডিভোর্সি বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো অবাধ চলাফেরার অবস্থা তৈরি হয়নি। ঠিক যেমনটা একজন ডিভোর্সি নারীর সুযোগ হয়নি। স্বাভাবিক চলাফেরা করলেও তাদের সবসময় হীনম্মন্যতাই ভুগতে হয়। কারণ, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকেই তারা বিশাল অস্তিত্ব সংকটে ভোগে। বিচ্ছেদের পর বাবা-মা যদি আবারও নতুনভাবে অন্য সম্পর্কে যায়, তাহলে আর কোনো কথাই নেই। এসময় তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে উত্কণ্ঠা কাজ করে সেটি হলো তারা কার কাছে থাকবে? বাবা নাকি মা! কিন্তু সন্তান কোথায় থাকলে তার জন্য মঙ্গলজনক হবে সে বিষয়ে বেশির ভাগ সময় তাদের ভাবা হয়না। অনেক সময় এরই জেরে ভাইবোনকে আলাদা হয়ে যেতে হয়। তখনই তাদের মধ্যে বিশাল ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আদালতের শরণাপন্ন হলে হয়তো আদালত তার বিবেচনাপ্রসূত একটি রায় দেয়। কিন্তু এই যে অপ্রত্যাশিত টানাপড়েন চলে তাতে ওই ছেলেটি কিংবা মেয়েটির ওপর অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে তাদের আচরণগত অসামঞ্জস্য দেখা যায়, পড়াশোনাসহ স্বাভাবিক জীবনে মনোযোগ হারায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সন্তানরা যদি বাবা-মায়ের স্বাভাবিক সঙ্গ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। তারা সমাজকে, পরিবারকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখে। তাদের মধ্যে জীবনবিমুখতা তৈরি হয়। যা ভয়াবহ।’
সম্প্রতি করোনাকালে বিবাহবিচ্ছেদের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। দাম্পত্য জীবনে কোলাহল, সহিংসতা, পরকীয়া, মাদকাসক্ত, সেল্ফ ডিপেন্ডেন্স ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। গত ছয় বছরে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অর্ধ লাখের বেশি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এ হিসেবে মাসে গড়ে ৭৩৬টি, দিনে ২৪টির বেশি এবং ঘণ্টায় একটি তালাকের আবেদন করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশ আবেদন জমা হচ্ছে নারীদের পক্ষ থেকে বলে এক জরিপে জানা গেছে।
বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিতে বিবাহবিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠতেই পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের আরেকটু সহনশীল হওয়া উচিত। সন্তানের ভালোলাগার জন্য বাবা-মায়ের কত ভালো লাগা হারিয়ে যায়, কত পছন্দ-অপছন্দে রূপ নেয় সেটা আমরা সন্তানেরা সবাই জানি। এছাড়া প্রত্যেকটি সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে শুরু থেকেই বিশ্বাসের ভিত গড়ে তুলতে হবে? থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও সহনশীলতা এবং সমঝোতার মানসিকতা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুস্থির হয়ে, অস্থির হয়ে নয়। রাগ বা অস্থিরতার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা বেশির ভাগ সময়ই সুখকর হয় না। তাই শুধু আবেগ দিয়ে নয় বিবেক বাস্তবতা সবকিছু মিলে এমন ধরনের জীবনমুখী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া উচিত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদালয়, কুষ্টিয়া
