অবিভাজ্য আগুনের ধর্ম

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২১, ২০:৫৯

না দিয়ে শুরু কেন আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি? এসব ক্ষুদ্রতা ও নেতির বিরুদ্ধে জাগতিক জেদ, মানবিক প্রত্যয়, সম্মিলিত প্রয়াসের ভাষা কোথায়? কোথায় ঐক্যবদ্ধ বীজতলার, বীজ বপনের উচ্ছ্বাসের ছায়া-প্রতিচ্ছায়ার চালচিত্র? অন্ধতা, মূঢ়তা, অবদমিত বিকৃতিকেই কি কেবল গুরুত্ব দেবে আমাদের যাপনের মুখপত্র?

একসঙ্গে চার শিশুর জন্ম দিয়ে আপ্লুত এক জননী; এই যে উত্তর চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত গ্রামের একজন একাকিনী দুর্বিষহ স্মৃতি অতিক্রম করে মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দিনরাত গা-গতরে খাটছেন; এই যে আবেগের নকশিকাঁথা ভেসে উঠেছে মেলা-হস্তমেলায়; এখানে-ওখানে বারবার শোনা যাচ্ছে যে, সম্প্র্রীতিই আমাদের ভিত; এই যে নৈরাজ্য আর বিভাজনের দূষিত কর্ষণের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকদের সর্বাত্মক লড়াইয়ের সরব অঙ্গভঙ্গি; এই যে জাতীয় সদ্ভাব দিয়ে বিভেদকামীদের প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার সংযত প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ সামাজিক নেতৃত্ব—এরকম অসংখ্য চিত্তজয়ী খবর ও তারুণ্যকে উঁচিয়ে ধরার সংকল্প আর বাঙালির ঐক্যের সত্যকে, নিহিত সত্যের প্রতিশ্রুতিকে জড়িয়ে সামাজিক নেতৃত্বের মুহুর্মুহু যে বার্তা দিচ্ছে, তা কি নেতির নির্বোধ ও ধ্বংসকামী ছকের খবরাখবরের চেয়ে বহু বেশি বলবান ও উপাদেয় নয়?

এরকম সংবাদ কেন মুখচ্ছবিতে ভাসবে না? এদের মুখের প্রথম আলো, দ্বিতীয় আলো, তৃতীয় আলোর উজ্জ্বলতাকে কি ঢেকে দেবে বীভত্স-কদর্যের, জনবিচ্ছিন্ন শক্তিবর্গের হুংকার আর হুমকি? এদের সঙ্গে নৃত্যরত প্রকৃতি, প্রকৃতির ছত্রছায়ায় লালিত মানুষের মঙ্গলবোধ ও শুভবুদ্ধির যোগ কোথায়? যার ইঙ্গিতে আমরা বেঁচে থাকি, মৃত্যুকে হার মানাই, যুদ্ধ-সংঘাত-সংঘর্ষকে ঘৃণা করি, অতীতের সুস্বাস্থ্য আর উজ্জ্বল মুহূর্তকে বারবার স্মরণ করি, উত্সবে মেতে উঠি—নাচতে থাকি নব আনন্দের সর্বময় ইঙ্গিতে, ছবি লিখি, কবিতা আঁকি, নৃত্যের তালে তালে গান শিখি, ছড়িয়ে দিই সংগীতের ঝংকার, সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে বেরিয়ে খোলা প্রাঙ্গণের বিমুক্ত প্রান্তরে চলচ্চিত্র উত্সবে ডেকে আনি সব ভাষার সব দেশের সিনেমাকে—এটাই তো বাঙালির অভিপ্রেত, মজ্জাগত চালচিত্র। এটাই তো তার মনন আর সৃজনের, কখনো নিভৃত, কখনো দৃপ্ত, বাঞ্ছিত উচ্চারণের একাগ্র স্বপ্ন। এখানে যে হাত দেয়, তার মুখ পোড়ে, ঘর  পোড়ে, পুড়ে যায় তার রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতির সমস্ত কৌশল। কেননা, বঙ্গভূমিতে এই কৌশলের ভিত নেই। খুঁটি নেই। ওরা বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের গুজবে তৈরি, রটনা আর রঞ্জিত-অতিরঞ্জিত খোয়াবের ওপর ভর দিয়ে উড়ছে। শুভবুদ্ধির ঘা পড়লেই এরা ধপাস। সব অর্থে ভুঁইফোঁড় আগাছার, কষ্টকল্পিত স্বপ্নের মৃত্যু অনিবার্য।

এরকম নিশ্চয়তার, সুদৃঢ় বিশ্বাসের কারণ কী? নিছক আশাবাদ? বিলকুল না। বাংলার মাটি, বাংলার বায়ু, বাংলার জল আর জন, বাঙালির ধারাবাহিক ভাবনা, স্বাতন্ত্র্যের নির্মাণ, তার শুভবোধ আর মনন তাকে যুগযুগ ধরে বলতে শিখিয়েছে—উদার হও, আকাশের দিকে তাকাও, ক্ষুদ্রতা পেরিয়ে সকলের ভাষা, সকলের সংস্কৃতি, সকলের ধর্মকে বরণ করে হরণ করো চিত্রের কৃত্রিম সীমান্ত। বাঙালির নাগরিক অভ্যাস, লোকায়ত বিষয়-আশয়ের সচেতন ও অবচেতন অনুশীলন নিজেকে চিনবার, মানুষকে জানবার আদেশ দিয়ে বলেছে, বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ। (গুরুসদয় দত্ত)। তার বাঙালিয়ানা, তার স্বাদেশিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতা বোধের বিরোধ নেই কোনো। আবহমান কাল ধরে সে পূর্ণ মানুষের উপাসনায় মগ্ন। এ উপাসনার অন্তর আর বাহিরকে কবিতায়, ছবিতে, গানে, কথকতায়, ধর্মচারের সহিষ্ণুতায় শিল্পিত করে তুলেছে অসংখ্য মনীষা। প্রকৃতির আহ্বানে সমৃদ্ধ, প্রাণিত বলেই বাঙালি সীমাকে প্রশ্রয় দেয়নি। সে আজ বিশ্বের আরেক বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। নিজের উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল দিনগুলি, তার আবহমান ঐতিহ্য, তার যুক্তি ও বুদ্ধির শুদ্ধ অঙ্গীকার আর ঐতিহ্যের বিস্তারকে বুকে জড়িয়ে বাঙালি, যে কোনো সামাজিক সংকটে, অরোপিত দুর্যোগে, কখনো সজল উচ্চারণে, কখনো প্রগাঢ় দৃঢ়তায় উঁচু করে তর্জনীকে। গর্জে ওঠে তার নেতৃত্ব। এমন একটি জাগ্রত, প্রাণচঞ্চল জাতিকে যারা খণ্ডিত-দ্বিখণ্ডিত করতে চাইছে, তাদের মূঢ়তার বিনাশ অশ্যম্ভাবী। কিছুসংখ্যক দিকভ্রষ্টের নীতি আর ক্ষুদ্রতাদুষ্ট চিত্কারের উদ্দেশে, প্রায় ৯৫ বছর আগে, নোয়াখালী সম্মেলনের অভিভাষণে, রবীন্দ্রময় এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১) প্রকারান্তরে জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমরাও যদি এরকম চিত্কার করতে থাকি, শ্মশানের শৃগালের চিত্কার শুনেও যেমন পথিক দূরে সরে যায়, আমাদের সে বিকট চিত্কার শুনেও বিশ্ববাসী ভারতের দিগন্ত প্রসারিত শ্মশান থেকে দূরে সরে যাবে; আর আমরা নরমাংসলা লুপ রসনা সঞ্চালন করতে করতে  রোষকষায়িত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চাইতে থাকব। বলা জরুরি যে, বিপত্কালের অন্তঃস্রোত আবার বইছে। উদ্ভ্রান্ত মস্তিষ্কের অঙ্গসঞ্চালন ফের দেখা যাচ্ছে। সম্মিলিত তর্জনীর গর্জন দিয়ে এদের রুখতে হবে। রুখতে হবে গঠনশীল রাজনীতির পাশে দাঁড়িয়ে, বাঙালিয়ানার মানবিক মূর্ত-বিমূর্ত মুনশিয়ানা দিয়ে। সামনে অগ্নিপরীক্ষা এবং আমাদের বোধ ও বধির চারপাশে স্পর্ধিতের কর্কশ কলরব। বাঙালি ঔদ্ধত্য সহ্য করে না, স্পর্ধাকে মিলিত প্রতিস্পর্ধা দিয়ে খুঁড়িয়ে দেয়। এ তার আবহমান সংহতি আর জাগৃতির অভ্যাস। দুর্যোগ যখন আসে, চেঁচিয়ে ওঠে জাতির মাতৃময়তা। এ শুধু হাহাকারে নয়, ঘুমপাড়ানিয়া গান নয়, আক্ষেপ নয়, লড়াকুর একাগ্রতাও বেজে ওঠে মাতৃকণ্ঠে, বর্গি এলো দেশে। এরকম মুহূর্তে প্রশ্ন তোলেন শ্বাশত জননী—খাজনা দেব কীসে? এ প্রশ্নে জড়িয়ে থাকে তার সমূহ সতর্কতা। কারণ প্রতিরোধ আর সমবেত লড়াই তার মননের, তার নিত্যযাপনের, তার অবিভাজ্য আগুনের সঙ্গী। এ আগুন চাপা দেবে, এই মুরোদ কোথায়? মুরোদের বহর সাজিয়ে যারা বিকৃত আওয়াজ তুলছে, বাঙালির গণইচ্ছা আজ তার চিত্তবৃত্তির শরিক হয়ে  মোক্ষম জবাব দিতে প্রস্তুত। তৈরি তার কণ্ঠস্বরের অযুত ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। অতএব, জয় আমাদের সুনিশ্চিত। আর ওদের মিথ্যা প্রেমের, ওদের ছলনার, ওদের পরাজিত গাজোয়ারির ধ্বংস অনিবার্য।

n  লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক