বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের মধ্যকার কানেকটিভিটি (সংযোগ) উন্নয়নেই ভারত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। তার মতে, দুই দেশের মধ্যকার সংযোগ এই অঞ্চলের চেহারা বদলে দিতে পারে। এই সংযোগই হলো উত্পাদনশীলতা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি সীমান্তে হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিসহ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২৬ ও ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি হিসেবে গতকাল এক দিনের সফরে ঢাকায় আসেন এস জয়শংকর। সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটিতে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। এরপর দুই মন্ত্রী দুপুরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে জয়শংকর বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের এমন কোনো দিক নেই যা নিয়ে আমরা কাজ করছি না। আমাদের সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে ৩৬০ ডিগ্রি। যতই কাজ করছি, ততই নতুন নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে। ৫০ বছরের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কানেকটিভিটি বড় পরিসরে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কানেকটিভিটির এই জায়গাকে আমরা বড় লক্ষ্য হিসেবে ধরে এগোতে পারি। ভারত ও বাংলাদেশ যদি কানেকটিভিটির জায়গায় ঠিকমতো কাজ করতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই বদলে যাবে; বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে তখন অন্যরকম মনে হবে। আমরা মনে করি, এটা সম্ভব। আজকের দিনে আমাদের আলোচনার বড় অংশ জুড়ে ছিল এটা। আমরা চাইলে এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশকেও একীভূত করতে পারি। যেমন জাপান, যাদের সঙ্গে আমাদের উভয় দেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় জাপান অনেক কানেকটিভিটি প্রকল্পে যুক্ত।
সীমান্ত হত্যা বিষয়ে জানতে চাইলে জয়শংকর বলেন, প্রত্যেকটি মৃত্যুই কষ্টদায়ক। এসব হত্যার পেছনের কারণ বুঝতে হবে। আমাদের নিজেদের জিগ্যেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে এবং আমরা জানি সমস্যাটি কী। সমস্যা হচ্ছে অপরাধ। তিনি বলেন, সীমান্তে এখানে কোনো ধরনের অপরাধ বা মৃত্যু থাকা উচিত নয়। সীমান্তে অপরাধ কমলে হত্যাও কমবে। সুতরাং আমাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন’ সীমান্ত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এবং আমি এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি, যেভাবে প্রতিবেশী ও বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা হওয়া দরকার।
ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। খুব শিগিগর সচিব পর্যায়ে বৈঠক হবে। আমি নিশ্চিত, তারা এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা চালিয়ে নেবেন। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে তিনি জানান।
এর আগে লিখিত বক্তব্যে জয়শংকর বলেন, আমরা বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও একটি মূল প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি। আমরা অন্যদের কাছে এই সম্পর্ককে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করি। এ কারণেই নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন ও সংযোগ, সংস্কৃতি, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ থেকে শুরু করে জ্বালানি ও অভিন্ন সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের যৌথ বিকাশসহ সব ধরনের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণ হলো—চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগরতলায় পরীক্ষামূলকভাবে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা, ত্রিপুরাকে বাংলাদেশের নৌপথে সংযুক্ত করার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথে দুটি নতুন প্রোটোকল রুট যুক্ত করা, ১০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ হস্তান্তর, কনটেইনার ও পার্সেল ট্রেন চলাচল শুরু এবং জ্বালানি খাতে একটি যৌথ উদ্যোগ গঠন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, পানি বণ্টন, বাণিজ্য সংযোগ, বিদ্যুত্ ও করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি উন্নয়নে সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা আলোচনা করেছেন। প্রত্যেকের অগ্রাধিকারকে পরস্পরের জন্য কীভাবে লাভজনক করা যায়, তার ওপর ভিত্তি করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
তিনি বলেন, চলতি মাসের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আমরা আনন্দিত, তিনি মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তির আয়োজনে অংশ নেবেন। ঢাকায় শিগিগরই বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর ওপর ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে বলে তিনি জানান।
