রংপুরে অবস্থিত বেগম রোকেয়া বিশ্ব-বিদ্যালয়কে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বলে অভিযোগ করেছেন উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। উপাচার্য তার নিজের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ ও ইউজিসির এমন তদন্ত শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আশকারায় হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন। তবে কলিমউল্লাহর অভিযোগ অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদ লিপিতে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে উপাচার্য কলিমউল্লাহকে বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ। উপাচার্য ঢাকায় বসে মিথ্যাচার করছেন, শিক্ষামন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন, এমন অভিযোগ তুলেছে সংগঠনটি।
জানা গেছে, অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ৪৫টি অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সম্প্রতি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ১০ তলা ভবন ও একটি স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণকাজে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে ইউজিসির আরেকটি সরেজমিন তদন্ত কমিটি। এর জন্য উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঐ কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কলিমউল্লাহ বলেন, ইউজিসির প্রতিবেদন কেন এমন হয়েছে, তার জন্যও পরিপূর্ণভাবে দায়দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রীর। তার পরামর্শে তদন্ত কমিটি এমন আচরণ করেছে। ইউজিসির মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি মনে করেন, এসবের পেছনে কুমিল্লা ও চাঁদপুরের রাজনীতি আছে। কারণ, তাদের দুই জনের (শিক্ষামন্ত্রী ও উপাচার্যের) বাড়ি একই অঞ্চলে।
দীপু মনির বিরুদ্ধে নিজের নানা অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তার সঙ্গে দেখা করতে যান সময় নির্ধারণ করেন, মন্ত্রণালয়ে তার অফিসে সকাল ১০টায় থাকলে তিনি হাজির হন বিকাল ৪টায়। আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পুরোটা দিন তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। কলিমউল্লাহ দাবি করেন, ইউজিসির রিপোর্টের পেছনে পুরোপুরি দায়-দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রীর। তার পরামর্শে কমিটি এই রকম রিপোর্ট করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য : এদিকে, বিকালে উপাচার্যের এই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা এম এ খায়েরের পাঠানো বক্তব্যে বলা হয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে নানা ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়। ইউজিসি তাদের নিয়মানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ইউজিসি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিধায় এ প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে কলিমউল্লাহর অভিযোগ অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এতে বলা হয়, উপাচার্য সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য রেখেছেন যা নিতান্তই অনভিপ্রেত। বলা হয়, শিক্ষামন্ত্রীর সময়ানুবর্তীতার বিষয়টি সবার কাছে সুবিদিত। তিনি সময়মতো সব সভায় অংশ নেন। সেদিনের সভার অনিচ্ছাকৃত বিলম্বকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কলিমউল্লাহ যে বক্তব্য রেখেছেন তা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনকই নয়, নিতান্তই রুচিবিবর্জিত।
ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা : রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ বৃহস্পতিবার দুপুরে উপাচার্যে বিরুদ্ধে পালটা সংবাদ সম্মেলন করে। এতে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান। উপাচার্য ঢাকায় বসে মিথ্যাচার করছেন, শিক্ষামন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন, এমন অভিযোগ তুলেছে শিক্ষকদের সংগঠনটি। এতে বলা হয়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ায় তিনি ঢাকায় বসে মিথ্যাচার করেছেন। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রীকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন উপাচার্য। ইউজিসি নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন। সরকারের উন্নয়নসহ সব বিষয়েই তিনি বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য করেছেন। তাই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো। এসব মন্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, গতকাল এক বিবৃতিতে উপাচার্য কলিমউল্লাহকে দ্রুত অপসারণ করে বিচার দাবি করেছে ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন।
কুশপুত্তলিকা দাহ : বেরোবি সংবাদদাতা জানান, উপাচার্য কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও মিথ্যাচারের অভিযোগ এনে মশাল মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল শেষে উপাচার্যের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। এ সময় তারাও তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। কুশপুত্তলিকা দাহ শেষে বিক্ষোভ সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি তুষার কিবরিয়া বলেন, ‘তার দুর্নীতির তদন্ত করায় শিক্ষামন্ত্রীসহ ইউজিসির বিরুদ্ধে ঢাকায় বসে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পে তিনি অনিয়ম করে—উলটো সরকারের বিভিন্ন মহলের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন। আমরা চাই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাহার করা হোক।’
