পড়ন্ত বস্তু

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ২০:১৪

মাধব রায়

কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

 

নীলকান্তবাবুকে চা দিয়ে কমলাও এক কাপ চা খেলেন। বাচ্চা-কাচ্চাদের বললেন, তোমরা এবারে পড়তে বসোগে যাও।

সবাই চলে গেলে তিনি বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিলেন, একটু রেস্ট দরকার। নীলকান্তবাবুও এসে শুলেন পাশে। বাচ্চা-কাচ্চারা বড় হচ্ছে। এরা অবশ্য পড়াশুনা ভালোভাবেই চালিয়ে নিচ্ছে। স্কুলের টিচারদের কোনও কমপ্লে­ন নেই। বড় হয়ে কে কী পড়বে এ নিয়ে নীলকান্তবাবুর কোনও টেনশন নেই। ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও, কিংবা ক্যাডার হয়ে প্রশাসনে যাও, এই নিয়ে তাঁর কোনও বাছবিচার নেই। তবে মানুষ হতে হবে। মানবিক গুণাবলির পরিপূর্ণতা থাকতে হবে। এর সামান্যতম ঘাটতি তাঁকে অবশ্যই পীড়া দেবে। ছেলেমেয়েদের তিনি অর্থের পিছনে ছুটতে দেখতে পছন্দ করবেন না, জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় স্বচ্ছলতা থাকলেই হলো। আর পড়াশুনার ব্যাপারটাও তিনি চাপিয়ে দিতে চাননি। কারণ তিনি তো জানেন, জগদীশ চন্দ্র বসুকে ডাক্তারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র এক বছরের পড়াশুনায় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁকে যদি জোর করে বাধ্য করা হতো, তাহলে কি বাঙালি একজন বিজ্ঞানী পেত? তিনি তো অতি সাধারণ একজন ডাক্তার হয়েই বেঁচে থাকতেন। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ও-তো ১৫৮১ সালে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হয়েছিলেন পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গণিত, বিশেষ করে জ্যামিতি ভালোবেসে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিলেন। স্টিফেন হকিং এর বাবাও চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক, কিন্তু হকিং পড়বেন অক্সফোর্ডে।

এরকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। সোমেন চন্দ-গল্পকার, প্রগতি লেখক সংঘের সংগঠক, তিনিও মেডিক্যাল সায়েন্সে ভর্তি হয়ে পড়ে বাদ দিয়ে দেন। এর জন্যই যার ঝোঁক যেদিকে, সেদিকে ধাবিত করলেই তারও উন্নতি হয়, দেশেরও লাভ। এই কথাটাই তিনি কমলাকে বোঝাচ্ছেন। কমলাও এতে একমত। তিনিও চান ছেলেমেয়েরা তাদের মতো করে বড় হয়ে উঠুক।

এর মধ্যে বিন্দুর চিত্কার শোনা গেল। এর বই কাগজ সব টেবিল থেকে ছিটকে পড়ে গেছে।

কমলা উঠে আসতে চাইলেন, নীলকান্তবাবু বললেন, তুমি থাকো, আমি দেখছি।

ব্যাপারটা হচ্ছে, বিন্দু ওর বই খাতা, বিগত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, স্কেল, পেন্সিল বক্স একে একে টেবিলে এনে রাখছে, পড়া শুরু করবে। অণু হঠাত্ করে ফ্যানের সুইচ অন করতেই এই কাণ্ড। বিন্দু এসে দেখে ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে সবকিছু। অণু হাত দিয়ে আটকাতে আটকাতেই সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে যায়। বিন্দু দেখে চিত্কার চেঁচামেচি শুরু করেছে-অণুদা আমার সবকিছু নষ্ট করে ফেলল।

অণু বলল-স্যরি বিন্দু, আমি তো ইচ্ছে করে ফেলিনি।

না, তুমি হঠাত্ করে ফ্যান ছেড়ে সব নষ্ট করে দিয়েছো।

আমি তুলে দিচ্ছি এক্ষুণি।

না, না তুমি পেপার ওয়েট না দিয়ে ফ্যান ছেড়ে দিলে কেন? বিন্দুর রাগ বাড়ছে।

নীলকান্তবাবু বিন্দুকে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, সে তো ইচ্ছে করে করেনি? তোমার ওগুলো তুলে গুছিয়ে দিচ্ছে।

বিন্দু তবু থামছে না, ওর বই খাতা নষ্ট হলে সে কষ্ট পায়। তার একেবারে কান্না পেয়ে যায়। নীলকান্তবাবু বিন্দুকে জড়িয়ে ধরলেন, আচ্ছা অণুকে বকে দেব, একটা বোকা কোথাকার।

বিন্দু তবুও থামছে না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওর কলমটাও নষ্ট হয়েছে। বল পয়েন্টের নিভ মেঝেতে পড়ে নষ্ট হয়েছে। টেবিলের নিচ থেকে উঠিয়ে দাগ দিয়ে দেখেছে সে। কাগজগুলো তো পড়েছিল দূরে।

                পরের অংশ আগামীকাল