সাভারে ঘরের আশায় পথে দেড়শ পরিবার

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ২২:০৬

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র

ইত্তেফাক রিপোর্ট

সাভারের বিভিন্ন এলাকার প্রায় দেড়শ পরিবারের কাছ থেকে একটি প্রতারক চক্র প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার নামে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ উঠার পর চক্রটির প্রধান আল আমিন এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ঘর ও নলকূপ দেওয়ার কথা বলে টাকা আত্মসাত্ করারও অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজেকে বঙ্গবন্ধু পক্ষাঘাত ও পেশাজীবী পরিষদের মহাসচিব বলে দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ঐ সংগঠনেরই সভানেত্রী ঝুমা খাঁন।

জানা গেছে, ‘জমি আছে, ঘর নাই’ প্রকল্পের নামে ঘর দেওয়ার কথা বলে সাভারের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি, নারী নেত্রী ও দলীয় নেত্রীদের নিয়ে প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছেন সাভার ডিবি অফিসের নিচে অবস্থিত বিট ফেয়ার ফ্যাশন নামক কারখানার এমডি আল আমিন। তিনি প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে অসহায় মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এর মধ্যে উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নের মহিলা ইউপি সদস্য সেলিনা বেগম ও আশুলিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সালমা বেগম প্রায় ৪০টি পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা মূল্যের ঘর দেওয়ার কথা বলে পরিবার প্রতি ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন। কাউকে বলা হয়েছে এনজিও থেকে, কাউকে বলা হয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে দেওয়া হবে এ সব ঘর। জনপ্রতিনিধিদের কথা মতো নিজেদের সারাজীবনের কষ্টার্জিত শেষ সম্বলটুকু তুলে দিয়েও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত ঘর। এদের কেউ কেউ ঘরের জন্য দেওয়া টাকার বিষয়ে জানতে গিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের হাতে লাঞ্ছিতও হয়েছেন।

ভুক্তভোগী বয়োবৃদ্ধ মালেক হোসেন বলেন, ‘দুটি পাকা ঘরের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিছি সেলিনা মেম্বারকে। দুই মাসের মধ্যে ঘর দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেছে। ছয় মাস পার হয়ে গেলে ঘরের বিষয়ে জানতে মেম্বারের কাছে গেলেও তিনি বকাঝকা দিয়ে তাড়িয়ে দেন। এখন কোথায় যাব, কী করব। কার কাছে বিচার চাইবো তাও জানি না।’ অপর ভুক্তভোগী মো. হাফিজ বলেন, ‘আমি একটি ঘরের জন্য ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ তুলে দেই। কিন্তু সেলিনা শুধু তিন গাড়ি ইট আর এক গাড়ি খোয়া দেন। পরে আমি নিজে আরো ইট আর বালু দেই। এভাবে দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হলেও বাকি কাজ করে দিচ্ছেন না । ’

মেম্বার সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমার পাশেই আশুলিয়ার ইউপির মহিলা সদস্য সালমা আক্তার এনজিও থেকে কয়েক জনকে টাকা নিয়ে দিয়েছে বলে জানতে পারি। সামনে নির্বাচন, যদি অল্প টাকায় আমিও গরিব দুঃখীদের ভালো ঘর করে দিতে পারি সেজন্য সালমার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সালমা বলেন, ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে একটি বিদেশি সংস্থা ঘর দিচ্ছে। চাইলে আমিও নিতে পারি। তার কথায় চার জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করি। পরে তিনি আরো ১৬টি ঘর নেওয়ার কথা বলে। আমিও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সালমাকে দেই। এখন সালমা আর কাজও করছে না, টাকাও দিচ্ছেন না।’ অভিযোগ অস্বীকার করে আশুলিয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত ২ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার সালমা আক্তার বলেন, ‘আমি চার জনের কাছ থেকে ৩০ হাজার করে টাকা নিয়ে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছি।’ সেলিনা মেম্বার তাকে ঘর নির্মাণের জন্য টাকা দিয়েছেন কি-না, জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু পক্ষাঘাত ও পেশাজীবী পরিষদের মাধ্যমে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ঘর ও নলকূপ দেওয়ার কথা বলে টাকা আত্মসাতের অভিযোগের ব্যাপারে ঝুমা খান বলেন, ‘আল আমিন নিজেকে মহাসচিব দাবি করে আমার কাছ থেকে ৬০টি ঘর ও নলকূপের জন্য ৭০ লাখ টাকা নেন। এর মধ্যে আটটি ঘর ও ১০ নলকূপ দেওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। চক্রের প্রধান আল আমিনের মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।

সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা একরামুল হক জানান, কোন প্রকল্প থেকে ঘর দেওয়া হবে বলে প্রতারক চক্র টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তা এখনো জানতে পারিনি। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ঘর ও নলকূপ দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা নীপা সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হবে। আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।