তবুও সতর্ক থাকিতে হইবে

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২১, ২১:৪২

আর কিছুদিন পরই আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করিব। এই পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অনেক কিছুতেই ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হইতে শুরু করিয়া এই সময়কালে বহু সরকার আসিয়াছে ও গিয়াছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন সরকার পরিচালনার সহিত যুক্ত। তাহাদের একেক জনের আমলে সমস্যা ছিল একেক রকম। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি দেশের যে কোনো প্রান্তে যান না কেন, সর্বত্র পরিবর্তনের ছোঁয়া লক্ষ করিবেন। বাউল গানে বলা হয়, ‘বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা, হরেক রকম পাগল নিয়ে মিলাইছ মেলা’। তেমনি আমাদের বলিতে ইচ্ছা করে, মাগো তোমার দেশে সকল উন্নয়নের খেলা, হরেক রকম উন্নয়ন নিয়া মিলাইছ মেলা। এই সকল উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞ দেখিয়া যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি চাহিলেও বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে গালি দিতে পারিবেন না। তিনি যদি নিরপেক্ষ লোক হন, তাহা হইলে তো কোনো কথাই নাই। জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিমান লোকের নিকট এই উন্নয়নের ধারা অনস্বীকার্য। এমনকি যে ভারত আমাদের স্বাধীনতা আনয়নে ত্যাগ-তিতিক্ষা করিয়াছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা তাহাদেরও ছাড়াইয়া যাইতেছি। ইহার পূর্বে আমরা যে পাকিস্তানের নিকট হইতে স্বাধীনতা লাভ করিয়াছি, উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে আমরা তাহাদের অতিক্রম করিয়া আসিয়াছি। পাকিস্তানের কোনো কোনো নাগরিক এখন বাংলাদেশকে অনুসরণের কথা বলিয়া থাকেন জোর গলায়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ ভারতের অনেক বুদ্ধিজীবীও বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া যাইতেছেন।

এখন আমরা দেখিতেছি বিদেশি অনেক নামিদামি ও স্বনামধন্য পত্রপত্রিকাও বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলিতেছে—দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হইতেছে বাংলাদেশ। গেল সপ্তাহে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) হইতে বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করিবার পরই এইরূপ স্বীকৃতি আরো বাড়িতেছে। এই উন্নয়নের বড়ো কারণ বিশেষ করিয়া গত এক দশকে আমাদের রপ্তানি খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ। বাংলাদেশের সাফল্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের উন্নয়ন মডেলের সাদৃশ্য বিদ্যমান। গত এক দশকে ডলারের হিসাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়িয়াছে ৮০ শতাংশ।

তবু আমাদের সতর্ক হইতে হইবে। উন্নয়নের মহাসড়কে উঠিয়া আত্মতুষ্টিতে ভুগিলে চলিবে না। আমাদের যাইতে হইবে বহুদূর। বাংলাদেশের উন্নয়ন লইয়া কোনো কোনো বিদেশি পণ্ডিতকে বলিতে শোনা যায়, যে দেশে এখনো মানুষ মানুষকে টানে, অর্থাত্ পথেঘাটে রিকশার বহর দেখা যায়, সেই দেশে উন্নয়ন আবার কীসের? আমাদের উন্নয়নের দুই চালিকা শক্তি হইল তৈরি পোশাক (গার্মেন্ট) রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের বহু কষ্টে প্রেরিত রেমিট্যান্স। বিশ্বব্যাপী করোনা মহাদুর্যোগের কারণে এই দুই খাত কি এখনো ঝুঁকিমুক্ত? কেহ কেহ দুর্নীতিকে সমস্যা মনে করিতেছেন। তবে ফার্স্ট জেনারেশন বা প্রথম প্রজন্মের শিল্পমালিকদের মূলধন গঠনে এমন আর্থিক বিশৃঙ্খলা কিছুটা থাকা অস্বাভাবিক নহে, যদিও ইহার রাশ বা লাগাম টানিয়া ধরা আবশ্যক। আবার আমাদের আরো উন্নয়নের জন্য ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। এই জন্য ভাঙার পরিবর্তে দেশ গড়িবার প্রতি আমাদের অধিক মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। কীভাবে আমরা অধিক ভালো করিতে পারি তাহাই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিত। আমরা আজ যাহা সবচাইতে ভালো (বেস্ট) করিব, তাহাই যেন পরবর্তীকালে তুলনামূলক ভালোতে (বেটার) পরিণত হয়। অর্থাত্ আমাদের সর্বদা সর্বোচ্চ ভালো করিবার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হইবে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি, উত্পাদন খরচ হ্রাস, দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য উন্নয়ন, উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সহিত বৃহত্তর সহযোগিতা ইত্যাদি আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইতে সহায়তা করিবে নিঃসন্দেহে।