আমার প্রথম ছবি বসুন্ধরা, পরিচালক ছিলেন সুভাষ দত্ত। প্রযোজনা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে এই ছবিটিতে অভিনয় করি আমি। ছবিটির প্রথম যখন শুটিং হয় তখন ছিল ২৬ মার্চ। আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল এই জন্য যে, আমি একটি মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে অভিনয় করছি। আর এখন যে ছবিটিতে শুটিং করছি সেটিও ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের রাতের ঘটনা নিয়ে। এটা একপ্রকার কাকতালীয়ভাবে মিলে গেল। আমি এখন যে কটি কথা লিখছি সেটিও মার্চ মাসের ঘটনা নিয়ে। কেন জানি সেদিনের স্মৃতি ভুলতে পারি না, ভুলতে পারবও না।
ব্যক্তিজীবনে আমি ২৬ মার্চ প্রত্যক্ষ করেছি। সেই দিনের স্মৃতি আজও অমলিন, বারবার নাড়া দেয়, বারবার মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কথা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন—আজ আমার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়। মূলত বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’
আমি তখন থাকি পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারে। তখন আমরা বন্ধু-বান্ধবরা তির, ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হতে থাকি। কিন্তু যখন দেখলাম ২৫ মার্চ সেই কালরাতে হানাদার বাহিনী লাশের পর লাশ ফেলে দিয়েছে, আমাদের ঢাকা শহর রক্তে লাল হয়ে গেছে; তখনই শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিতে থাকি। ওরা যে কত হিংস্র ছিল লাশের পর লাশ দেখে আমরা বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই এদের মোকাবিলা করতে হলে আমাদেরও সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আর তখনই মনে পড়ে বাঙালি জাতি মরতেও শিখেছে, মারতেও শিখেছে। অবশেষে লাখ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে, হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়।
কিন্তু যে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাদের দামাল ছেলেরা, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে অকাতরে, একটি মুক্ত স্বাধীন দেশ পাওয়ার প্রত্যাশায়। সেই স্বাধীনতা কী পেয়েছে আমাদের মুক্তিকামী মানুষেরা? যে স্বাধীনতার স্বপ্ন আমরা দেখেছি, এই ৫০ বছরে আমরা কি তা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? মানুষের মনের ভেতরে ক্ষোভ কাজ করছে, কোথায় গেল সেই স্বপ্ন, বারবার মনে পড়ছে। আগামী প্রজন্ম যাতে সুখে-শান্তিতে সুন্দরভাবে জীবন কাটাতে পারে—এই প্রার্থনা করি সব সময়।
লেখক :চলচ্চিত্র অভিনেতা ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রধান
