রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল তার ‘দ্য পলিটিকস’ গ্রন্থে বলেছেন, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। যে মানুষ সমাজে সভ্য নয়, সে হয় দেবতা, না হয় পশু। মানুষ সমাজেই জন্মগ্রহণ করে এবং লালিতপালিত হয়। সামাজিক রীতিনীতি, নিয়মকানুন, প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়। আর সামাজিকীকরণ এমন একটি প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবশিশু সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয়, সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও ভাবধারা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। অর্থাত্ সমাজের একজন কাঙ্ক্ষিত পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠে।
সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত ছোটবেলা থেকেই। আর শিশুর সামাজিকীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে পরিবার। পরিবারকে শিশুর মূল পীঠস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। পরিবারের সুস্পষ্ট ও সঠিক দিকনির্দেশনাতেই শিশুর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বলা হয়ে থাকে, শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে বংশগতি মূল উপাদান জোগায়, সংস্কৃতির নকশা অঙ্কন করে এবং পিতামাতা কারিগর হিসেবে কাজ করেন। একটি শিশু তার দৈহিক, মানসিক এবং বস্তুগত ও অবস্তুগত যাবতীয় প্রয়োজন পরিবার থেকেই মেটায়। পরিবারেই শিশুর চিন্তা, আবেগ ও কর্মের অভ্যাস গঠিত হয়। একটি শিশুর সুকোমল বৃত্তিগুলো এবং সুপ্ত প্রতিভা পরিবারের মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে। শিশু পরিবার থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করে, পরিবার থেকেই একটি শিশু আচার-আচরণ, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে। সুতরাং সমাজের একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি।
আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত্। এরাই আগামীতে নেতৃত্ব দেবে দেশ ও জাতিকে, এদের আচার-আচরণ, ব্যক্তিত্বই পরিলক্ষিত হবে দেশ ও জাতির ওপরে। কাজেই শিশুর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ওপর দেশ ও জাতির ভাগ্যও অনেকাংশই নির্ভরশীল। একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে পিতা-মাতার মধ্যে সম্পর্ক, পিতা-মাতা ও শিশুর মধ্যে সম্পর্ক এবং পরিবারের শিশুদের মধ্যে সম্পর্কের ওপর। পিতা-মাতার মধ্যে সম্পর্ক মধুর হলেই সে পরিবারের শিশুরা সুন্দর পারিবারিক পরিবেশে নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে পিতা-মাতার মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, মারামারি বা পারিবারিক অশান্তি বিরাজ করলে সে পরিবারের শিশুদের মধ্যে মানসিক-দৈহিক সমস্যা দেখা দেয়, সামাজিক মূল্যবোধের মতো তাত্পর্যপূর্ণ গুণাবলি ব্যাহত হয় এবং তারা নানা ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, পিতার অত্যধিক শাসন কিংবা মায়ের অধিক স্নেহ শিশুর সামাজিকীকরণ বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে শিশুর আচরণ গঠনের প্রতি পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকার সমন্বয় করতে হবে। পরিবারের সব সদস্যের ভূমিকার মধ্যে সমন্বয় সাধনই শিশুর আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। পিতা-মাতা ও শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করলে পরবর্তী সময় ঐ শিশুকে আত্মসচেতন, ব্যক্তিত্ববান হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
একটা সময় আমাদের দেশে যৌথ পরিবার দেখা যেত ব্যাপক পরিমাণে। মূলত এই যৌথ পরিবার প্রথা সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসা সামাজিক ব্যবস্থা যা মানুষের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একটি যৌথ পরিবারে নানা বয়সি মানুষের বসবাস। বলতে গেলে নানা অভিজ্ঞতার বাতিঘর যৌথ পরিবার। ফলে যৌথ পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শিশু খুব সহজেই জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাদের মনোবল প্রবল হয়, হতাশা তাদের গ্রাস করতে সক্ষম হয় না। তাদের মানসিক বৃদ্ধি ও পরিপক্বতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক মাত্রায় হয়। পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একক পরিবারের অভিভাবকরা খুব কমই উপলব্ধি করেন শিশুর সামাজিকীকরণ নিয়ে। ফলে এসব শিশু সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়।
একটি শিশু তার পরিবার থেকে যে শিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়, তা তাকে পরবর্তী জীবন পরিচালনার জন্য পথনির্দেশ দিতে থাকে। কাজেই শিশুর যথাযথ সামাজিকীকরণ নিশ্চিত করতে ছোটবেলা থেকেই অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
