৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি দেশে দেশে পালন করা হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে নারী দিবস পালনের ব্যাপ্তি বেড়েছে। মূলত নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েই এই দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর এক একটি মূল প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ফলে নারীর অবস্থা ও অবস্থান পরিবর্তনে ইতিবাচক ফল লক্ষ করা যাচ্ছে। আমাদের দেশেও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি অবশ্যই ঘটেছে। তবে নারী-পুরুষের সমতা, ক্ষমতায়ন, অধিকারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এখনো নানা ধরনের বাধা আছে, সমস্যা আছে। নারীকে এখনো ঘরে-বাইরে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নারীর নিরাপত্তা এখনো ঝুঁকির মধ্যে। যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় অনেক নারীকে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যার শিকার হতে হচ্ছে এখনো নারীদের। শেখ হাসিনার সরকার নারীবান্ধব নীতি, আইন, পদক্ষেপ নিয়ে নারীদের জীবনে অনেক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে এখনো অনেকেই উদারতা দেখাতে পারেন না।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘যারে তুমি নীচে ফেল, সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে, সে তোমারে টানিছে পশ্চাতে।’ নারীদের পেছনে রেখে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না, কারণ তারা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক। অর্ধেক কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এই বোধ এবং উপলব্ধি যখন জাগ্রত হয়, তখন সমস্যা হয় না। কিন্তু এই বোধ-উপলব্ধিতে ঘাটতি যখন বেশি ছিল, তখন নারীকে দেখা হতো অর্ধেক মানুষ হিসেবে। কিন্তু ধারাবাহিক চেষ্টার ফলে এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নারীর ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইটা নারীরই। তবে পুরুষের সহযোগিতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনেক পুরুষকেও দেখা যায়, নারী-পুরুষের সমতার লড়াইয়ে শামিল হতে। রবীন্দ্রনাথের উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে : ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেহ নাহি দিবে অধিকার/ হে বিধাতা, নত করি মাথা, পথপ্রান্তে কেন রব জাগি/ ক্লান্ত ধৈর্য প্রত্যাশা পূরণের লাগি, দৈবাগত দিনে’।
জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এখন প্রায় সব দেশই দিবসটি পালন করে সরকারি এবং বেসরকারি নানা উদ্যোগ-কর্মসূচির মাধ্যমে। বাংলাদেশে নারী দিবস পালন শুরু হয় মূলত পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে সীমিত পরিসরে। মহিলা পরিষদ গঠনের পর এই সংগঠন প্রকাশ্যে নারী দিবস পালন করতে থাকে। নারীকে সম্মান করা, তাকে নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিটা বাম প্রগতিশীলরাই প্রসারিত করেছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশের যে সমৃদ্ধযাত্রা তাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এটাকে কোনোভাবেই আর পেছনে ঠেলা যাবে না। দেশের শ্রমবাজারে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ নারী। এই নারীদের আবার ৭৫ শতাংশই গ্রামে বাস করেন। গ্রামীণ নারীর ৭২.৬ শতাংশ কৃষিতে, ১১.৫ শতাংশ গ্রামীণ শিল্পে এবং ১৫.৯ শতাংশ নারী গ্রামীণ সেবা খাতে কাজ করেন। গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশই নারী। ফসলের বীজ সংরক্ষণ, ফসল তোলা, মাড়াই ও সংরক্ষণসহ কৃষিকাজের নানা পর্যায়ে নারী অসাম্য অবদান রাখছে। হাঁস-মুরগি পালন এবং এগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসা-বাণিজ্যেও নারী ক্রমেই অধিক সংখ্যায় যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু কৃষক হিসেবে নারীর স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন সেভাবে হয় না। এমনকি জমির মালিকানা না থাকায় কৃষক হিসেবে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য যে কার্ড দেওয়া হয়, তা নারীরা না পেয়ে সাধারণত পুরুষ কৃষকরাই বেশি পেয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীসমাজ আরো নানাভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রাখছেন। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে সরাসরি কাজে অংশ নিয়ে সার্বিক উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করছেন, দেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাকশিল্পে প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির জোগান দিচ্ছেন নারীরা, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ নারীরা অংশ নিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড ছাড়াও সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। মানবসম্পদ উন্নয়নে নারী অবদান রাখছেন শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে। সন্তানদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এনে এবং নিয়মিত স্কুলে পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে সুস্থ সবল শিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীরা নীরবে ভূমিকা রেখে চলছেন। দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমার পেছনে সরকারি সাফল্যের পেছনেও নারীর সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিষয়টি কোনোভাবেই গৌণ নয়।
এটা এখন অনেকেই স্বীকার করেন যে, উপার্জিত অর্থ ভালোভাবে কাজে লাগানো, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা এবং শিশু রক্ষণাবেক্ষণে নারীর দক্ষতা বেশি। তার পরও এখনো নারী ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, সামাজিক-পারিবারিক বিধিনিষেধসহ কিছু বাস্তব কারণে নারীরা নিজের ইচ্ছায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।
নারী দেশ চালাতে পারে, যুদ্ধ করতে পারে, বিমান চালাতে পারে, পর্বতচূড়ায় উঠতে পারে আবার সংসারেরও হাল ধরতে পারে নিপুণ হাতে। অবহেলা, অসম্মান নয়—নারীকে দিতে হবে জীবনবিকাশের বাধামুক্ত পরিবেশ। নারীরা তাই এখন সুযোগ চায় না, চায় ন্যায্য অধিকার। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অব্যাহত প্রেরণার উত্স হয়ে থাকুক—এটাই আমাদের চাওয়া।
n লেখক :সমাজকর্মী
