কারাগারে ঢোকার একটি গেট। অন্যকোনো স্থান থেকে বন্দিদের পালানোর সুযোগ নেই। সাধারণত কারা কর্তৃপক্ষের ‘অসতর্কতা’ এবং আরেক জনের জামিনের সুযোগ নিয়ে বন্দি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে অল্প মেয়াদে সাজা প্রাপ্তরা কখনো পালায় না। পালায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, খুনের মামলার আসামিরা; যাদের বড় সাজার আশঙ্কা রয়েছে। তারা ছলচাতুরি আশ্রয় নিয়ে পালাবার সুযোগ খুঁজতে থাকে। জেল কোডে বলা আছে—এ ধরনের বন্দিদের ক্ষেত্রে সব সময় কঠোর নজরদারিতে রাখা। কিন্তু জেল কোডের নিয়ম মানা হলে এসব বন্দি পালানোর সুযোগ পাবে না। অপর দিকে অনেক কর্মকর্তার আয়-বাণিজ্যে ঘাটতি পড়ে। কারণ বড় কোনো কারাগারে পোস্টিং পেতে দক্ষতার চেয়ে টাকা গুরুত্ব পায়। কারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ শনিবার সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়মিত বন্দি গণনাকালে ফরহাদ হোসেন রুবেল নামে এক বন্দির অনুপস্থিতির বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। ফরহাদ হোসেন ওরফে রুবেল খুনের মামলার আসামি। এ ঘটনার পর ঐ দিন বিকালে তার সন্ধানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বাজানো হয় ‘পাগলা ঘণ্টা’। কারাগারে মোতায়েন করা হয় বাড়তি পুলিশ। কারাগারে চলে তল্লাশি। এ ঘটনায় নগরীর কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়েছে। এর আগে গত বছর ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারা-২ থেকে মই দিয়ে পালিয়ে যায় আবু বকর সিদ্দিক ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামি। পালিয়ে যাওয়া এই দুই আসামি গতকাল পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। তবে গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মিন্টু মিয়া নামের এক বন্দি পালিয়ে যায়। পরদিনই তাকে পুনরায় আটক করা সম্ভব হয়। এর আগে ২০০৭ সালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেওয়াল টপকে (দড়ির সাহায্যে) পালিয়ে ছিল জঙ্গি আব্দুর রহমানের ছেলে। তবে ঘটনার পরপরই এলাকাবাসীর সহায়তায় কারারক্ষীরা তাকে ধরে ফেলেছিল। উল্লেখ্য, সারাদেশে কারাগারের সংখ্যা ৬৮টি। এরমধ্যে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার। ৫৭টি জেলা কারাগার। এসব কারাগারে বর্তমানে মোট বন্দির সংখ্যা প্রায় ৮৭ হাজার।
এ ব্যাপারে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুল হক বলেন, যে অন্যায় করবে, তাদের মধ্যে গাফিলতি পাওয়া যাবে, অনিয়ম করবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আপস নেই। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করবে সে অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা সূত্র জানায়, বন্দি পেরিয়ে যাবার তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ছোট কারাগার থেকে বন্দি পালাবার রেকর্ড কম। যে সংখ্যক পালিয়েছে, তারা বড় কারাগার থেকে। কারণ, ছোট কারাগারে বন্দি থাকে তিন থেকে সাড়ে তিনশ মধ্যে। এ সব কারাগারে যারা পোস্টিং পান সেগুলো স্বাভাবিক নিয়মে হয়ে থাকে। তবে বড় কারাগারগুলোতে পোস্টিং পেতে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। ফলে কাঙ্ক্ষিত কারাগারে পোস্টিং পাওয়ার পর তাদের লক্ষ্য থাকে যেনতেনভাবে টাকা আয়ের দিকে। ফলে বন্দিদের দিকে তাদের নজর থাকে কম। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগায় পালানোর মতলবে থাকা বন্দিরা।
এ ব্যাপারে সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব.) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, সারা দেশে সব ক্ষেত্রে উন্নতি হচ্ছে। সবকিছু এখন ডিজিটাল। কারাগারগুলোতে বাড়ছে কারারক্ষী, কারা কর্মকর্তা ও ডাক্তারের সংখ্যা। সেখানে এভাবে বন্দি পালানোটা ভালো লক্ষণ না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ কারা কর্মকর্তা বলেন, জেলকোড বিধি বিধান অনুসরণ করা হলে বন্দি পালানোর মতো ঘটনা ঘটত না। তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে পোস্টিং দেওয়া উচিত। সত্ এবং যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে আরো শক্ত অবস্থানে যেতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বছর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে বন্দি পালানোর পর তত্কালীন আইজি প্রিজন্স স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে (কারাগারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কারা বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো) বলা হয়, ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো কারাগারে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এমনকি বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে যা চরম প্রশাসনিক দুর্বলতার নামান্তর। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
