৪৬ বছরের পথচলা। শুরুতে কেউ কেউ নাক সিঁটকেছিলেন, আবার স্বাগত জানিয়েছিল অনেকেই। সেটা ১৯৭৫ সালের কথা। সেই শুরুর পথচলাকে ধারণ করে দেশের বিচারাঙ্গনে ন্যায়দণ্ড হাতে আলো ছড়াচ্ছেন নারী বিচারকেরা। অধস্তন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত—সব জায়গায় নারী বিচারকেরা বিচারের আসনে বসে ন্যায়বিচারের দূত্যি ছড়াচ্ছেন।
১৯৭৪ সালে সরকার বিচারক (মুন্সেফ) পদে নিয়োগের জন্য প্রথম দরখাস্ত আহ্বান করে কাগজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেই নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, যিনি দেশের প্রথম নারী বিচারক। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে খুলনার জজশিপে মুন্সেফ হিসেবে যোগ দেন। অধস্তন আদালত থেকে হাইকোর্ট, এরপর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে ২০১৬ সালে অবসরে যান তিনি। অবসরের দিন বিদায় সংবর্ধনায় তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আজ বাংলাদেশে শত শত নারী বিচারকের জন্ম হতো না।’ তার এই বক্তব্যের যথার্থতাই প্রতিফলিত হয়েছে বিচারাঙ্গনে নারীর অগ্রযাত্রায়। তার দেখানো পথেই এখন হাঁটছেন ৫৫১ জন নারী বিচারক, যাদের ওপর অর্পিত রয়েছে বিচারের গুরুদায়িত্ব। শুধু বিচারের দায়িত্বই নয়, বিচার বিভাগ থেকে প্রেষণে আসা অনেক নারী বিচারকই প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন করছেন সাফল্যের সঙ্গে। তাদের অনেকেই আছেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন, আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। সর্বশেষ চার জন নারী বিচারক আজ যাচ্ছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে। তারা সেখানে ‘রুল অব ল’ অ্যাডভাইজরি শাখায় এক বছর প্রেষণে জাস্টিস অ্যাডভাইজার হিসেবে বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কাজ করবেন। নারী বিচারকদের এই অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে দেশের বিচার বিভাগের জন্য মাইলফলক।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ৯৮ জন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ছয় জন বিচারক রয়েছেন। সেখানে কোনো নারী বিচারপতি নেই। উচ্চ আদালতে বিচারপতি রয়েছেন ৯২ জন, যার মধ্যে নারী বিচারপতি সাত জন। তারা হলেন :বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বিচারপতি নাঈমা হায়দার, বিচারপতি কৃঞ্চা দেবনাথ, বিচারপতি কাশেফা হোসেন, বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি কাজী জিনাত হক।
বিচারপতি সালমা মাসুদ ছাড়া ছয় জন বিচারপতিই হাইকোর্টের দ্বৈত ও একক বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। রিট, ফৌজদারি মোশন ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ-সংক্রান্ত মামলার শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করছেন দ্রুততার সঙ্গে। দিচ্ছেন বিভিন্ন মামলায় যুগান্তকারী রায়। আর অধস্তন আদালতে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৮৪৫ জন বিচারক। এর মধ্যে নারী বিচারক রয়েছেন ৫৪৪ জন, যারা জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ হিসেবে বিচারের আসনে দায়িত্ব পালন করছেন।
নারী বিচারকদের সফলতার গল্প সম্পর্কে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি কোনো বিচারককে নারী বা পুরুষ হিসেবে দেখতে রাজি নই। যারা বিচারক, তারা বিচারকই। তিনি কোন জেন্ডার ধারণ করেন সেটা অপ্রাসঙ্গিক। আমি ১০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। আমার ছাত্রদের অনেকেই এখন হাইকোর্টের বিচারক। আছেন নিম্ন আদালতেও। তারা পুরুষ বিচারকদের সঙ্গে মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা করে নিজেরা স্থান করে নিয়েছেন। কেউ তাদের অধিকার দেবে না। নিজের যোগ্যতা, মেধা, সততা ও পরিশ্রমের গুণেই সেটা তাদের আদায় করে নিতে হবে।’
১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীরা বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা বিসর্জন দিতে হয়েছে। কেননা, ঐ সময় পর্যন্ত নারীদের বিচারক হওয়ার পদে পরীক্ষা দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। পরের বছরই ঐ বিধিনিষেধ তুলে নিলে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় নারীদের। বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিন পালটেছে। পরিবর্তন হয়েছে মানসিকতার। এখন নারী বিচারকদের সবাই সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন।
ইত্তেফাক/কেকে
