সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম করা হয়, ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করতে পারি, যদি-’। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, নিরস্ত্র গণহত্যার তদন্ত এবং নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তোলেন বঙ্গবন্ধু।
প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আপনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকেছেন, আগে আমার এসব দাবি মানতে হবে তার বিবেচনা করবো পরিষদে যোগ দেবো কিনা। এসব দাবি পূরণ ছাড়া পরিষদে যাওয়ার অধিকার বাংলার মানুষ আমাকে দেয় নাই।’

ইত্তেফাকের ৮ মার্চের প্রথম পাতার নিচের অর্ধেকটা জুড়ে ছিল রেসকোর্স ময়দানের একাংশ। এর ওপরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দেওয়া ১০টি নির্দেশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-
১. বাংলার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ রাখুন।
২. সারা বাংলাদেশের সেক্রেটারিয়েট-সরকারি ও আধা সরকারি অফিস, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং অন্যান্য কোর্টে হরতাল করুন (কোথাও শিথিল করা হলে জানানো হবে)।
৩. রিকশা, অটো, বাস-ট্যাক্সি প্রভৃতি এবং রেলগাড়ি ও বন্দরগুলো চালু রাখুন। কিন্তু জনগণের ওপর জুলুম চালানোর উদ্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর চলাচলের কাজে রেলওয়ে ও বন্দর কর্মচারীরা সহযোগিতা করবেন না এবং সেক্ষেত্রে তাদের চলাচলের ব্যাপারে কোনো কিছু ঘটলে আমি দায়ী হবো না।
৪. বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসেবীরা আমাদের বিবৃতি-বক্তৃতার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করবেন এবং গণ-আন্দোলনের কোনো খবর গায়েব করবেন না। যদি তাতে বাধা দেওয়া হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাঙালিরা কাজে যোগ দেবেন না।
৫. শুধু লোকাল এবং আন্তঃজেলা টাস্ক-টেলিফোন যোগাযোগ অব্যাহত রাখুন।
৬. স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধু রাখুন।
৭. সব বাড়ির ছাদে প্রতিদিন কালো পতাকা উড্ডীন রাখুন।
৮. ব্যাংকগুলো প্রতিদিন দুই ঘণ্টা খোলা রাখুন।
৯. অন্যান্য ক্ষেত্রে আজ থেকে হরতাল প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনো সময় আবার আংশিক বা সর্বাত্মক হরতাল ঘোষণা করা হতে পারে, সেজন্য প্রস্তুত থাকুন।
১০. স্থানীয় আওয়ামী লীগ শাখার নেতৃত্বে অবিলম্বে বাংলার প্রতিটি ইউনিয়ন, মহল্লা, থানা, মহকুমা ও জেলা পর্যায়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করুন।
ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার না করার প্রতিবাদে এবং বাংলার সংগ্রামী জনতার দাবির মুখে বেতারের সব কর্মচারী সহযোগিতা না করায় ৭ মার্চ বিকাল থেকে ঢাকা বেতারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ‘ঢাকা বেতার বন্ধ’ শিরোনামে ৮ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় খবরটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতা প্রচারের জন্য আগের কয়েকদিন বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি উঠেছিল। তাই ঢাকা বেতার কর্তৃপক্ষ ভাষণটি প্রচারে সিদ্ধান্ত বেতারের মাধ্যমে ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে তা করা হয়নি। বরং ৭ মার্চ দুপুর ২টা ১০ মিনিট থেকে বিকাল ৩টা ২০ মিনিট পর্যন্ত বেতারে বেজেছে দেশাত্মবোধক গান, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
‘জয় জনতার জয়’ শিরোনামের খবরে ইত্তেফাকের ৮ মার্চের প্রথম পাতায় জানানো হয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ঢাকা বেতারে প্রচারে অনুমতি দিয়েছে সামরিক কর্তৃপক্ষ। ৭ মার্চ রাতে বেতারের বাঙালি কর্মচারীদের সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষের আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূলত ২ মার্চ থেকেই বেতারের শিল্পীরা জনতার সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
ইত্তেফাক/জেএইচ
