মার্চ মাস বাঙালির জীবনে অসীম তাত্পর্যপূর্ণ। এই মাসই ধারণ করে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য কঠিন পণের চূড়ান্তপর্ব এবং একই সঙ্গে সূচনাপর্ব। কেননা যে অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব ধাপে ধাপে বাঙালির অধিকার রক্ষার সংগ্রাম থেকে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম রচনা করে, সেই নেতৃত্বদানকারী নমস্য ব্যক্তির জন্ম এই মাসে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম ১৭ই মার্চ।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ মার্চ (১৯৪৮)। সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে শিক্ষার্থী সমাজ সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করে। ঐ ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার হোন শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদসহ অনেকে। ৭ই মার্চ (১৯৭১) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, যে ভাষণে তিনি সব বাঙালিকে একত্র হয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়তে উদ্বুদ্ধ করেন, স্বাধীনতাসংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা প্রদান করেন এবং ‘সাত কোটি বাঙালিকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’ বলে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন। আর ঘোষণা দেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
৭ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলে অসহযোগ আন্দোলন। তারই অঙ্গুলিহেলনে তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ চলে। ঐ সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। তিনি যা নির্দেশ দিতেন বাঙালিরা তা পালন করত। তিনি নির্বাচিত কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়েও পূর্ব পাকিস্তানের জনসমর্থন-ভিত্তিক কর্তৃত্বে ছিলেন।
এদিকে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমস্যা সমাধান নিয়ে ঢাকায় আলোচনা করছিলেন এবং আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল তার সরকার। ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ২৫ মার্চ (১৯৭১) রাতে পাকিস্তানি হায়েনার দল নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৬শে মার্চের ভোরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে।
২৬৫ দিনের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলার অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই ভারতের সরকার ও জনগণকে—তারা আমাদের এই অস্তিত্বের যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শামিল হয়েছিল। সব শহিদ মুক্তিযোদ্ধার মাগফেরাত কামনা করি এবং সব মুক্তিযোদ্ধাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার মাগফেরাত কামনা করি।
মার্চ মাস একদিকে আমাদের জন্য খুবই কষ্টের—একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানিরা বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। অপর দিকে মার্চ মাস আমাদের অতীব গৌরবের মাস—একাত্তরের এ মাসেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম এবং এ মাসেই দখলদার পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে আমাদের মহান বিজয়ে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
ইত্তেফাক/এসআই
