অহংকার, অহমিকা ও দম্ভ ইত্যাদি মানুষের শোভা পায় না। এই সকল বৈশিষ্ট্য মানুষের জন্য নহে। ইহা সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রেই মানায়। তিনি সর্বশক্তিমান। আমরা যাহা কিছুই করি না কেন, ইহা তাহার অনুগ্রহের ফল; কিন্তু সচরাচর দেখা যায়, আমরা কোনো সাফল্যের জন্য নিজের কৃতিত্বকে ফলাও করিয়া প্রকাশ করি। অনেক সময় অহংকারে পা মাটিতে নামিতে চাহে না। সৃষ্টিকর্তার দয়া না থাকিলে আমরা যে ইহা করিতে পারিতাম না, তাহা আমরা বেমালুম ভুলিয়া যাই। আমরা তাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও কার্পণ্য বোধ করি। ইহা মোটেও কাম্য নহে। জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে সমগ্র বিশ্ব আজ হাতের মুঠায় আসিয়া গিয়াছে। আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের কথাবার্তা শুনিতেছি। তাহাদের ভাষণ পড়িতেছি পত্রপত্রিকায়। তাহাদের অহমিকা দেখিলে মাথা হেঁট হইয়া আসে। তাহারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্য ও কৃতিত্বগাথা তুলিয়া ধরিলেও কস্মিনকালেও সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণে আনেন না। তাহার রহমতের কথা বলিয়া শুকরিয়া আদায় করিতে চাহেন না। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই এক সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। সকল ভালো কাজের পিছনে তাহার অভিপ্রায়ের যে প্রতিফলন রহিয়াছে, তাহা স্বীকার করা আবশ্যক। এক অদৃশ্য মহান শক্তি আমাদের এই সকল করাইয়া লইতেছেন। তাহা সত্ত্বেও প্রচার-প্রপাগান্ডার সময় আমরা কীভাবে তাহার আনুকূল্যের কথা ভুলিয়া যাই?
উপরিউক্ত বোধ নিজের মধ্যে জাগ্রত না হইলে নিজেকেই চিনা সম্ভব নহে। গ্রিক দার্শনিকগণ তাই বলিয়া গিয়াছেন—‘নো দাইসেলফ’। অর্থাত্ তুমি পূর্বে নিজেকে জানো। কেননা নিজেকে জানিবার প্রচেষ্টার মধ্যেই সৃষ্টিকর্তাকে জানিবার পথ তৈরি হইয়া যায়। এই জন্য ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হইল—মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু। যে নিজেকে জানিল, সে প্রকারান্তরে তাহার প্রতিপালককেও জানিল। কোথা হইতে মানুষ আসিয়াছে, বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ পরিচালনার মাধ্যমে দুনিয়াতে কীভাবে সে সক্রিয় রহিয়াছে এবং মৃত্যু শেষে সে কোথায় চলিয়া যাইবে, কী তাহার পরিণতি হইবে—এই সকল ভাবিলে সৃষ্টিকর্তার সন্ধান পাওয়া কঠিন নহে। আর তাহাকে সর্বদা হাজির-নাজির জানিতে পারিলে এবং নিজের মধ্যে তাহার অপরিসীম ক্ষমতার ক্রিয়া-প্রক্রিয়াজাত উপলব্ধি হইলে যে কোনো সামান্য কাজে সফলতা আসিবার পরও তাহার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। বিশ্বের শাসক ও রাজনীতিবিদরা অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি যে বোঝেন না, তাহা নহে; কিন্তু তাহারা কথা ও কাজে এই বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটাইতে হীনম্মন্যতার পরিচয় দিয়া থাকেন।
আমাদের বক্তব্য হইল—আমরা যতই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাই না কেন, আমাদের আত্মতৃপ্তি ও আত্মদম্ভের অবকাশ নাই। আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি অনুগত থাকিয়া অবশ্যই মডেস্ট বা বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন হাম্বল বা বিনয়াবনত হওয়া। সকল কৃতিত্ব সৃষ্টিকর্তার। আমরা তাহার অভিপ্রায় বাস্তবায়নের অসিলা বা বাহক মাত্র। ব্যবসায়-বাণিজ্য, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সর্বত্র আমরা যতই উন্নতি করি না কেন, তাহার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত। কেননা তিনি আমাদের সেই ভালো কাজ করিবার তওফিক বা ক্ষমতা দিয়াছেন। মহানবির (স.) মক্কা বিজয়ের পর সুরা নাসর অবতীর্ণ হয়। নাসর অর্থই সাহায্য। সৃষ্টিকর্তার সাহায্য ও বিজয় লাভে তাহার প্রতি আরো অনুগত ও বিনয়ী হইবার এবং ভুলত্রুটির জন্য তাহার নিকট ক্ষমা চাহিবার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে এই সুরায়। যাহারা ক্ষমতায় থাকেন ও সফল হন, তাহাদের এই বাস্তবতা অবশ্যই স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। ইহার উপরই পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করে। প্রকৃতপক্ষে আত্মার আনন্দ পরমাত্মার চাওয়া-পাওয়ার উপরই নির্ভরশীল। তিনি খুশি হইলেই তবে আমাদের ইহ ও পরজীবন সার্থকতা লাভ করিবে।
