সমতাই হোক আজকের অঙ্গীকার

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২১, ২১:৫০

আমাদের সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনা মূলত ঘটনা এবং দিবস কেন্দ্রিক। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আজকের লেখাটাও ৮ মার্চের নারী দিবসকে কেন্দ্র করেই রচিত।

বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, তাদের কাজের প্রশংসা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে মহিলাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাফল্য অর্জনের উত্সব হিসেবেই পালন করা হয়।

মন্দের ভালো বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোই হোক কিংবা প্রগতিশীলতার স্ফুরণ—বর্তমান সমাজ সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে অন্তত সচেতন। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য—নেতৃত্বে নারী : কোভিড-১৯ বিশ্বে সমান ভবিষ্যত্ অর্জন।

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগেও যেখানে নারী অবহেলিত ছিল, পুরুষ তথা সমাজের ভোগের বস্তু, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কিন্তু এই ধারণার বেশ পরিবর্তন এসেছে। গত ১০০ বছরে পৃথিবীতে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু সেই তুলনায় বাঙালি নারীসমাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে বেগম রোকেয়ার নাম প্রতিষ্ঠিত। সমালোচকরা বলেন যে, রোকেয়া কেবল সমাজের উচ্চবিত্ত এক খণ্ডিতাংশকে নিয়েই তত্পর ছিলেন। ক্ষমতা সম্পর্কের নিচের তলায় থাকা নারীদের নিয়ে তার কোনো কার্যক্রম ছিল না। সেই তুলনায় ইলা মিত্র কিংবা প্রীতিলতাকে তারা বেশি বাহবা দিতে উদগ্রীব; কিন্তু নারীমুক্তির জন্য কেবল নারীকেই লড়ে যেতে হবে, আবার সমাজ পরিচালক পুরুষ, ক্ষেত্রবিশেষে নারীর এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি আদতে ঠিক নয়।

সমাজে নারী-পুরুষ উভয়কেই নিজেদের প্রাপ্য অধিকার সমানভাবে বুঝে নিতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নারী-পুরুষের সমন্বয়েই সমাজ গঠিত, তাই পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র, সরকার ও সংস্থার প্রধান হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। এছাড়া বিভিন্ন সাংগঠনিক পদেও নারীর অন্তর্ভুক্তিও স্বস্তিদায়ক। বাংলাদেশেও সরকার কাঠামো হতে শুরু করে নানান সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট খাতেও নারীরা আসছেন; কিন্তু সমাজনিয়ন্তা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো অতীতের মতো প্রশ্নবিদ্ধ। এখনো গণপরিবহন, পার্ক, রেস্তোরাঁ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থানকে বেশ বাঁকা চোখেই দেখা হয়। এমনকি নিজ পরিবারেও নারীকে হতে হয় বৈষম্যের শিকার। নারীর সমতা ও ক্ষমতা নিশ্চিতকরণে আমাদের মানসিকতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। 

নারীর অবদান অস্বীকারের ওপরেই যেন পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভরশীল। নারীর কাজের জন্য যথোপযুক্ত স্বীকৃতি দিতে হবে। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও অধিকারের ক্ষেত্রে নারীর অবদানের প্রতিদান থাকা আবশ্যিক। একে সমাজ বিকাশের বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে। এতে করে নারী-পুরুষের মিলিত সমাজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে বই কমবে না। প্রাপ্য অধিকার পেতে নারীকে সোচ্চার হতে হবে, এজন্য দরকার শিক্ষায় নারীর শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নারীর ক্ষমতায়ন তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন নারী অর্থনৈতিকভাবে অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজ যোগ্যতায় কর্মক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ করবে। এ জন্য কেবল শিক্ষা নিশ্চিত করলেই হবে না, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্ব্বী করে তুলতে দরকার নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীর সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ। নারীকে হতে হবে কর্মমুখী, তাতেই প্রতিষ্ঠা পাবে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ঘটবে নারীমুক্তি। নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে বিভিন্ন সময়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার; কিন্তু নারীকে কেবল সমাজের একটি অবহেলিত অংশরূপে বিবেচনা করে তাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস সত্যিই দুঃখজনক। এমন পদক্ষেপ ক্ষেত্রবিশেষে হিতে বিপরীতও হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারীর শিক্ষকতার যোগ্যতায় কেবল উচ্চমাধ্যমিক পাশের শর্ত নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বুনিয়াদি শিক্ষা প্রদানে প্রাথমিকের শিশুদের মনস্তত্ত্ব গঠনে প্রয়োজন দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা; কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা একজন মেয়ের যেখানে নিজেরই জ্ঞানজগত্ বিকশিত নয়, সে কীভাবে কোমলমতি শিশুদের জ্ঞানের রাজ্যে নিয়ে যাবে? থেকে যাচ্ছে প্রশ্ন। এ অবস্থায় করুণা নয়, কারিগরি শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীকে কর্মোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই তা সমাজের জন্য মঙ্গলকর হবে।

পুরুষের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মপ্রতিষ্ঠান, উপার্জনের সুযোগ। নারী-পুরুষ তথা গোটা জাতিকে এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেই নিশ্চিত উন্নত হবে দেশ।

লিঙ্গ-সমতার প্রভাব শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবায় প্রতিফলিত হয়, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বিশ্বের দেশগুলো ধীরে ধীরে একটি ধ্বংসাত্মক মহামারি থেকে সেরে উঠতে শুরু করেছে, প্রান্তিক পর্যায় থেকে উত্তরণের জন্য হাতে হাতে নারী-পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে কাজ করতে হবে।  বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কবিতার সত্যতা যুগে যুগে প্রমাণিত হয়ে এসেছে। এ সত্যকে মেনে নারী-পুরুষের সমন্বয়ে একযোগে কাজ করতে পারলেই উন্নয়ন সুনিশ্চিত, নিশ্চিত হবে নারীমুক্তি তথা সামাজিক আলোকায়ন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।