বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত সিরাজগঞ্জের সমৃদ্ধশালী তাঁত শিল্পের প্রসারে যারা মূল ভূমিকা পালন করেন তারা নারী শ্রমিক। একটি শাড়ী বা লুঙ্গী তৈরিতে ৯টি ধাপের মধ্যে ছয়টি পর্যায়েই মূল ভূমিকায় থাকা দলিত নারী আপুচি বালাদের মতো জেলার লাখো নারী দুঃখজনকভাবে পুরুষের চেয়ে মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী জিনিস এরা জানেন না। তাদের জন্য আলাদা কোনো দিবস নির্ধারিত আছে সেটাও ভাবতে পারেন না। তারা কেবল জানেন যুগ-যুগ ধরে পুরুষদের মতো সমান তালে কাজ করলেও তাদের তিন ভাগের এক ভাগ মজুরি পাচ্ছেন। তারা মহাজনদের বলেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো সরকারিভাবে নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়েছে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা নারী নেত্রীরা।
এনায়েতপুর থানার তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ গোপিনাথপুর গ্রামের দলিত নমসদ্রু বংশের শ্রীমতি আপুচি বেছে নিয়েছেন এলাকার সবার অন্যতম পেশা তাঁত শ্রমিকের কাজ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরন্তরভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন চরকার হাতল। চড়কায় এক পাশে সুতা কেটে ববিনে তোলেন। এভাবে এক ডবল সুতা কাটতে তাকে সুদক্ষ হাতে অন্তত দুই দিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এজন্য ডবল প্রতি তাকে মহাজন মজুরি দিয়ে থাকেন মাত্র ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। এর মধ্যে সুতার মাড় তৈরিতে চাল কিনে অন্তত ৯০/১০০ টাকা তাকে খরচ করতে হয়। তাতে দিন ৮০/৯০ টাকা হারে মজুরি পেয়ে থাকেন।
মজুরি নিয়ে এমনি আক্ষেপের কথা জানালেন, একই গ্রামের মৃত বৈদ্যনাথ সরকারের স্ত্রী বৃদ্ধা তাঁত শ্রমিক মিনতি বালা (৭৫) এবং গোবিন্দ সিংয়ের স্ত্রী সাজোন্তি সিং (৪০)। তারা জানান, পরিবারের অভাবের কারণে সাত-আট বছর বয়স থেকে সুতা কাটার কাজ করছি। তখন পেয়েছি ২৫ পয়সা মোড়া (১০টি পোল্লা)। এখন পাই দুই টাকা মোড়া। দিনে বাড়ির কাজের পাশাপাশি সাত-আট মোটা সুতা কাটলে ২০ থেকে ২৫ টাকা মজুরি পাই। এই দিয়ে চলা কঠিন। তারা আক্ষেপ করে আরো জানান, পুরুষদের ঠিকই ন্যায্য মজুরি দেওয়া হয়। আমাদের বেলায় বৈষম্য। কাউকে বলেও লাভ নেই। আর নারীর অধিকার এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়েও তারা কিছু জানে না বলে জানালেন।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজিপুর ও সদর উপজেলার ২০ হাজার তাঁত মালিক তাদের প্রায় ২ লক্ষাধিক ইঞ্জিন এবং হস্তচালিত তাঁতে অন্তত কয়েক লাখ অসহায় নারী শ্রমিক এভাবে কাজ করছেন।
এদিকে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা নারী নেত্রী এবং বেলকুচি পৌরসভার সাবেক মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস ও এনজিও কর্মী বিশিষ্ট সমাজসেবী জুলেখা খাতুন জানিয়েছেন, তাঁত শিল্পে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো সরকারিভাবে নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
