নিজেদের অধিকার আদায়ে নারীদের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২১, ০০:৩৫

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের নারীসমাজকে নিজ নিজ অধিকার আদায়ে নিজেদের যোগ্যতর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের এই সমাজকে যদি আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে বলেন, ‘আমি নারীদের একটা কথাই বলব, নারীদের ‘ধিকার দাও, অধিকার দাও’ বলে চিত্কার করা, বলা আর বক্তৃতা দেওয়া—এতে কিন্তু অধিকার আদায় হয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হবে। অধিকার আদায়ের মতো যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। সেই যোগ্যতা আসবে শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। যে কারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই এদেশে নারী শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক করে দেন জাতির পিতা।’

তার সরকার ২ কোটি ৫ লাখ ছেলেমেয়েকে বৃত্তি-উপবৃত্তি দিচ্ছে, যার মধ্যে বেশির ভাগই নারী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজকে যদি গড়ে তুলতে হয়, তবে নারী-পুরুষ সবাইকেই শিক্ষা দিতে হবে, যে কারণে আমরা প্রতিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রেও নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ’৯৬ সালে সরকারে এসে দেখেছেন কোনো নারীই ডিসি, এসপির কোনো পদ পেতেন না, উপজেলায় কোনো ইউএনওর পদ পেতেন না, কিন্তু তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন সব পদে নারীরা আসীন হয়েছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদীয় উপনেতা সবাই মহিলা। এটাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অর্জন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে ধর্মের নাম নিয়ে বা সামাজিকতার কথা বলে নারীকে পশ্চাত্পদ করে রাখার অপচেষ্টা সমাজ থেকে দূর হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা পাশ কাটিয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী নারীদের সম্মাননা দেওয়ার জন্য বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পাঁচ জন ‘জয়িতা’কে জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ‘নারী’র কয়েকটি পঙিক্ত ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীকে আপন ভাগ্যবিধাতা হতে হবে। নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি। তুলে ধরেন নারীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় বিভিন্ন আইন প্রণয়নের কথাও। মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ছয় মাস বর্ধিতকরণসহ সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজের এই অর্ধেক অংশ যদি অকেজো থাকে, সমাজটা তাহলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার ’৫৪ সালের চীন সফর নিয়ে লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইয়ের কয়েকটি বিশেষ লাইনের উদ্ধৃতি দেন। জাতির পিতা বলেন, ‘নয়াচীনের মেয়েরা আজকাল জমিতে, ফ্যাক্টরিতে, কলকারখানায়, সৈন্যবাহিনীতে দলে দলে যোগদান করছে। তাদের সংখ্যা স্থানে স্থানে শতকরা ৪০ জনের ওপরে।’ জাতির পিতা আরেক জায়গায় বলেছেন, ‘ইসলামিক ইতিহাস পড়লে জানা যায় যে, মসলমান মেয়েরা পুরুষদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যেত, অস্ত্র এগিয়ে দিত, আহতদের সেবাশুশ্রূষা  করত। হযরত রসুলে করিম (সা.)-এর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা.) নিজে বক্তৃতা করতেন। দুনিয়ায় ইসলামই নারীর অধিকার দিয়েছে।’ তিনি এ সময় দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার মা, মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মানুষ করার পাশাপাশি যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জেলে থাকতেন, তখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে দলের কার্যক্রম দেখা, আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা—সবকিছু তিনিই করেছেন পর্দার আড়ালে থেকে, কখনো কোনো প্রচার তিনি চাননি। কাজেই আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার পেছনে আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অনেক অবদান রয়েছে।’

আলোচনা পর্বের মাঝে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। এবারও পাঁচ জনকে জয়িতা সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন—অর্থনৈতিকভাবে সফল নারীর ক্যাটাগরিতে হাছিনা বেগম নীলা, শিক্ষা ও চাকরির সাফল্যের ক্যাটাগরিতে মিফতাহুল জান্নাত, সফল জননী নারী ক্যাটাগরিতে মোসাম্মাত্ হেলেন্নেছা বেগম, নির্যাতিতা-বিজয়ী নারী ক্যাটাগরিতে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রবিজান এবং সমাজ উন্নয়নে অসমান্য অবদানের জন্য অঞ্জনা বালা বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে ১ লাখ টাকার চেক, সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন। মহিলা ও শিশু প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। জয়িতা পদকপ্রাপ্তদের পক্ষে বক্তৃতা করেন জয়িতা হাছিনা বেগম নীলা। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, পদস্থ সামারিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন ও দূতাবাসের প্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।