করহার বিনিয়োগকে নিরুত্সাহিত করছে :এমসিসিআই

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২১, ২১:৩০

ইত্তেফাক রিপোর্ট

দেশের উচ্চ করহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কথা হচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায়ও ইস্যুটি তুলেছে দেশের ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই)। এমসিসিআইর সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর বলেন, করহার আমাদের ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুত্সাহিত করছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে আয়োজিত ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ। গত বছর ৩৫ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ কমিয়ে আলোচ্য হারে আনা হয়। এমসিসিআইর সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলো দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দিয়ে থাকে। এমসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের আমদানিতে কর দিতে হয়, মধ্যবর্তী বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এবং উত্পাদিত পণ্যের ওপরও কর দিতে হয়। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে করহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হয়ে যায়। এর আগে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (ফিকি) পক্ষ থেকেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উচ্চ করহারের ইস্যুটি আলোচনায় আনা হয়।

এ সময় এমসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, ভূমি নিবন্ধন ফি এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট করে দেওয়া রয়েছে। এটি প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। ফলে এর মাধ্যমে বৈধ উপার্জনের একটি অংশ অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে করহার কমিয়ে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্জিত পুরো অর্থকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমসিসিআই সভাপতি বলেন, এতে রাজস্ব আহরণে কোনো ঘাটতি হবে না। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের প্রণোদনার ক্ষেত্রে রাশ টানার দাবি জানিয়ে বলা হয়, এ ব্যবস্থা থাকার কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এমসিসিআইর পক্ষ থেকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিষয়ে মোট ১০৭টি প্রস্তুাব তুলে ধরা হয়। এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন এমসিসিআইর ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন সাব কমিটির চেয়ারম্যান আদিব এইচ খান। তিনি বলেন, সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৯ সাল থেকে যে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ২০১২ সালের আইন নয় বরং ১৯৯১ সালের আইনে ফেরত চলে গেছে। নতুন আইনের মূল স্পিরিট ছিল মূল্য ঘোষণা থাকবে না। কিন্তু ইনপুট আউটপুট কো-ইফিশিয়েন্টের (উত্পাদ সহগ) মাধ্যমে আসলে পেছনের দরজা দিয়ে সেই মূল্য ঘোষণাতেই চলে যাওয়া হলো। এটি বাতিলের দাবি জানান তিনি। এছাড়া কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থার অস্পষ্টতা দূর করা, আগাম করহার এক শতাংশ কমানো, রাজস্ব বিরোধে আইনি প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম করহার কমানো, সরবরাহ গ্রহীতার মিথ্যা ঘোষণার জন্য সরবরাহকারীকে শাস্তি প্রদানের বিধান বাতিল করাসহ বেশ কিছু প্রস্তাব করা হয়।

অন্যদিকে কোম্পানির পণ্য প্রচারের ক্ষেত্রে অনুমোদনযোগ্য ব্যয় বার্ষিক বিক্রয়ের ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে এমসিসিআই। সভা শেষে এমসিসিআইর এক জন নেতা সাংবাদিকদের বলেন, পৃথিবীর আর কোথাও এ ধরনের ব্যয়ে সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। এর ফলে ব্যবসা নিরুত্সাহিত হবে। অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এ ধরনের ব্যয়ে ০.৫ শতাংশ বেঁধে দেওয়া মোটেই কম নয়, চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। তিনি বলেন, আপনারা একটা কিনলে পাঁচটা ফ্রির নামে পচা জিনিস ধরিয়ে দেবেন, সেটা তো আমরা অনুমোদন দেব না। ভোক্তার অধিকার দেখতে হবে।

এছাড়া দিনের অন্য আলোচনায় বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডব্লিওসিসিআই), বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিসিসিআই), উইমেন অন্টারপ্রেণার নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (ওয়েন্ড), তামাকবিরোধী জোট আত্মা তাদের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরে। বিডব্লিওসিসিআইর সভাপতি সেলিমা আহমাদ করোনা পরিস্থিতিতে নারী উদ্যোক্তাদের আয়কর ও ভ্যাটে ছাড় দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এনবিআরের আইনের কিছুক্ষেত্রে লঙ্ঘন করছেন বলেও জানান।

ইন্ডিয়া বাংলাদেশ চেম্বারের (আইবিসিসিআই) সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বাংলাদেশ ভারতে পণ্যবাহী ট্রেন যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বিদ্যমান বাধা অপসারণ ও স্থানীয় শিল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন।

বিসিসিসিআইর পক্ষ থেকে আমদানি রপ্তানিতে চীনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ এইচ এস কোড (পণ্য পরিচিতি নম্বর) গ্রহণে উদ্যোগ নেওয়া, ইলেক্ট্রিক গাড়ির শুল্ক প্রত্যাহারসহ বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ সময় বিসিসিসিআইর সভাপতি গাজী গোলাম মর্তুজা, যুগ্মমহাসচিব আল মামুন মৃধা ছাড়াও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।