পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২১, ২১:৫৫

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) পদের সেই সম্মান এখন আর নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিদের প্রচণ্ড একক ক্ষমতার অপব্যবহারের (শিক্ষক, কর্মকর্তা/কর্মচারী নিয়োগ ও বিভিন্ন আর্থিক বিষয়ে) ফলে ভিসিরা তাদের যথাযথ সম্মান হারাচ্ছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের এখন প্রায়শই জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হতে দেখা যাচ্ছে। যতটা না তাদের ভালো কাজের জন্য, তারচেয়ে বেশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিসিদের স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক সম্পৃক্ততা, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে (একাডেমিক ও প্রশাসনিক) দুর্নীতি ইত্যাদি খবর যেন এখন অনেকটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরাতন কি নতুন, নামকরা কি নামহীন—সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রই এক। ভিসিদের সম্মান তাদের ক্ষমতার দাপটে বিলীন হচ্ছে।

যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) পদটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভিসির ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা, আদর্শ, সততা ছাড়াও তার ইচ্ছা, মেজাজ, মর্জি ইত্যাদির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছু নির্ভর করে। প্রচলিত নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিসিদের ক্ষমতা এরকমই দেওয়া হয়েছে। ভিসিরা দ্বায়িত্ব পাওয়ার পর তার নিজ পছন্দমতো আজ্ঞাবহ লোক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সব স্তর সাজিয়ে নিতে পারেন এবং করছেনও তাই। এই চিত্র কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন দেখা যাচ্ছে। সত্, যোগ্য ও ভালো লোক ইচ্ছে করলেও ভিসিদের কাছে ভিড়তে পারেন না। ভিসিদের চারদিকে রাজনৈতিক লেবাসধারী সুবিধাভোগী চাটুকারদের ভিড়ে খুব কম ভিসিই আছেন যারা অপেক্ষাকৃত সত্ লোকজন দিয়ে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারেন। কারণ চাটুকারদের বলয় ভেদ করে ভিসিদের কাজ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আশঙ্কার বিষয় হলো, ভিসিদের আজ্ঞাবহ লোকের (শিক্ষক, কর্মকর্তা/কর্মচারী) চাটুকারিতার কারণে অনেক সময় ভিসিরা চরম স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন এবং নিজেকে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী মনে করেন। আর এভাবেই ভিসিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, শৃঙ্খলা, নিয়মকানুন-সংক্রান্ত অনেক ক্ষতি হয়ে যায় যা ভিসিরা বুঝতেই চান না। একটা কাজ প্রায় সব ভিসিই করে থাকেন তা হলো—নিজের ছেলে/মেয়ে/বউ বা কাছের আত্মীয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানানো। এই পদে তাদের যোগ্যতা থাকলে তো বলার কিছু নাই; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—যোগ্যতা না থাকলেও ভিসিরা তাদের আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দিয়ে দেন। আইনের তোয়াক্কা করেন না, বরং সব ধরনের যোগ্যতা (বয়স, একাডেমিক রেজাল্ট ইত্যাদি) শিথিল করে নিয়োগ প্রদান করেন। তখনই এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়, পত্রপত্রিকায় নিউজ হয় এবং একসময় সবাই জানতে পারে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা এরকম নিয়োগ দিয়ে প্রচণ্ড সমালোচনার শিকার হয়েছেন।  একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখা গেছে—ভিসি হওয়ার আগে একজন প্রফেসর বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে কাজ করলেও ভিসি হওয়ার পরে তা তারা আর ধরে রাখতে পারেন না। বেশির ভাগ ভিসির মেয়াদকালের শেষ সময়টা খুব বাজেভাবে শেষ হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান নিয়ে ফিরতে পারেন না। অনেককে রাতের আঁধারে অনেকটা নিভৃতে পালিয়ে আসতে দেখা যায়। যা একজন ভিসির জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর এবং ভিসি পদের জন্য কলংকও বটে। লক্ষণীয় যে, যে সব প্রফেসর তাদের চাকরিজীবনের একবারে শেষ সময়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান কিংবা যে সব প্রফেসর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান (অর্থাত্ যাদেরকে ভিসির মেয়াদ শেষে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার বাধ্যবাধকতা থাকে না) তাদেরকেই ভিসির ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকটা বেপরোয়া হতে দেখা যায়। অবশ্য সব ভিসির ক্ষেত্রে একথা সত্য নয় বরং অনেক ভিসিকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়, তবে সে সংখ্যা খুব বেশি নয়। সুতরাং দুর্নীতিপরায়ণ ভিসিদের তাদের অনৈতিক কাজের জন্য যেমন জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন অন্যদিকে সফল ভিসিদের ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মূল্যায়ন করা উচিত।

ভিসির পদ হচ্ছে একজন শিক্ষকের সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গা, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বেশির ভাগ ভিসিই মেয়াদ শেষে একজন সাধারণ শিক্ষক হয়ে যান। খুব কম ভিসিই আছেন যারা ভিসি-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুযোগ পান। যদিও বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভিসির চেয়ে বড় সম্মানের জায়গা, যেমন—দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। আবার অনেক ভিসিকে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসির দ্বায়িত্ব পালন করতেও দেখা যায়। তাই ভিসিদের আরো সতর্ক হয়ে প্রজ্ঞা, আদর্শ, সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা উচিত। ভিসি পদের যথাযথ সম্মান সমুন্নত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকা উচিত।

ভিসি হওয়ার জন্য কোনো কোনো প্রফেসরকে এতটা নিচে নামতে দেখা যায় তা কল্পনাও করা যায় না, নিজের চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস হবে না। ভিসি হতে অনেক প্রফেসর আজকাল বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। আবার অনেকেই শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি হতে চান যেখানে তার সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা থাকে প্রচণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিপ্রার্থী শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড কাদা ছোড়াছুড়ি করেন। নিজে ভিসি হতে না পারলেও অন্যকে কীভাবে ঠেকানো যায় তার প্রাণপ্রণ চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। নামে-বেনামে একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করেন ও পত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদ ছাপান। আশ্চর্যের বিষয় হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলো এখন অতি সাধারণ প্র্যাকটিসে পরিণত হয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত। এখানে সরকারকে অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে ভিসি নিয়োগ করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রের অন্যতম স্পর্শকাতর জায়গা। তবে এ কথাও সত্য যে, একজন প্রজ্ঞাবান, যোগ্য, সত্ শিক্ষককে খুঁজে বের করে ভিসি নিয়োগ দেওয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য সরকার ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ভিসি নিয়োগের একটা প্রচলন চালু করেছে, যাতে করে সঠিক লোককে বাছাই করে ভিসি নিয়োগ দেওয়া যায়। যদিও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন-চার মাস পার হলেও ভিসি নিয়োগ হতে দেখা যায় না, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। তাই সরকারের উচিত, ছয় মাস আগে থেকেই এসব বিষয়ে আগাম চিন্তাভাবনা করা, যাতে সময় হলে দ্রুত ভিসি নিয়োগ দেওয়া যায়। এছাড়া প্রত্যেক ভিসির জন্য বাধ্যতামূলক পালনীয় কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। বিশেষ করে নিয়োগ, ব্যক্তিগত খরচসহ অন্যান্য আর্থিক বিষয়ে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্ত চিন্তাচেতনা, শিক্ষা ও গবেষণার তীর্থস্থান, ভিসিদের সেচ্ছাচারিতার জায়গা নয়।

n লেখক : অধ্যাপক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ফেলো শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালয়েশিয়া, মালয়েশিয়া