বাঙালির জীবনে মার্চ মাসটা নানা কারণে স্মরণীয়। এই মাসেই উচ্চারিত হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা। এই মার্চেই নীল আকাশে উড়েছে জাতির পতাকা—এই মার্চেই রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে স্বাধীনতার ডাক। এই মার্চেই টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আবার এই মার্চেই আমরা হারিয়েছি লাখো স্বজনকে। মার্চ বাঙালির জীবনে আনন্দ-বেদনা আর গৌরবের মাস।
উনিশ শ’ একাত্তরে অগ্নিঝরা সেই মার্চের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ নীল আকাশে উড়িয়ে দিয়েছে জাতির পতাকা। উত্তরকালে এই ঘটনা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে সঞ্চার করেছে সাহস আর অনুপ্রেরণা। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ছাত্র-ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বন্দি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই ঘটনার রয়েছে বহুমাত্রিক তাত্পর্য। বঙ্গবন্ধুর বন্দি হবার ফলে চাঙ্গা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন—এই ঘটনার মধ্য দিয়েই জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।
মার্চ মাসের ৭ তারিখটা এখন তো কেবলই বাঙালির। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের, ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আজ বিশ্বমানবের গৌরবিত ঐতিহ্য। বাংলাদেশের ভূগোল ছাড়িয়ে ৭ই মার্চের ভাষণ আজ সমগ্র পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত। একটি ভাষণ একটি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে—বিশ্ব-ইতিহাসেই এমন দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত নেই।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়, যুক্তকালীন নয় মাসে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির কাছে অনুপ্রাণনার অন্তহীন উত্স—মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনপণ অভিযানের শ্রেষ্ঠতম পাথেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নিষ্ঠুরতা-মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাঙালির কাছে, মুক্তিবাহিনীর কাছে ছিল তা চরম ও পরম দিক-নির্দেশনা।
একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। সে এক দুঃসহ দিন। মার্চেই শহিদ হন অগণিত বাঙালি। এই মার্চেই বাঙালি গর্জে ওঠে সম্মিলিত শক্তিতে, ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। এই মার্চের ২৬-এর প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। তারপর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করি বহুকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
মার্চ প্রতি বছর বাঙালির কাছে আসবে আনন্দ আর আশ্বাসের বার্তা নিয়ে, গর্বের আর গৌরবের উত্স হয়ে। একই সঙ্গে মার্চ আমাদের সিক্ত করবে অন্তহীন বেদনায়। এই আনন্দ বেদনা গৌরব নিয়েই মার্চ এখন কেবলই বাঙালির মাস। [লেখক :প্রাবন্ধিক ও গবেষক]
