বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

ভারতের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগে জাতীয় আয় বাড়তে পারে ১৭ শতাংশ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২১, ২২:৪৮

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে উভয় দেশ লাভবান হবে। এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ভারতের জাতীয় আয় বাড়তে পারে ৮ শতাংশ পর্যন্ত।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘কানেকটিং টু থ্রাইভ :চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস অব ট্রান্সপোর্ট ইন্টিগ্রেশন ইন ইস্টার্ন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়েছে, ভারতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্রাজিল অথবা জার্মানির সঙ্গে বাণিজ্য করতে যে খরচ হয়, তার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ ভাগ বেশি খরচ বেশি হয় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে। মূলত উচ্চহারে ট্যারিফ, প্যারা-ট্যারিফ এবং অশুল্ক বাধার কারণে খরচটা বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যে যে হারে ট্যারিফ দিতে হয় সেটি বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। দুই দেশ যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে সেক্ষেত্রে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৮২ শতাংশ (প্রায় দ্বিগুণ) বাড়তে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে ভারতের রপ্তানি বাড়তে পারে ১২৬ শতাংশ পর্যন্ত।

গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা ও নয়াদিল্লি অফিসের যৌথ উদ্যোগে ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়ং টিমবন এবং ভারতের কান্ট্রি ডিরেক্টর জুনায়েদ আহমেদ বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

আরো বক্তব্য দেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাথিয়াস হেরেরা দাপে এবং লিড প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিষ্ট চার্লস কুনাকা।

প্রতিবেদেন বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল (বিবিআইএন) মটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট এর বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক বাণিজ্যে পিছিয়ে রয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশের ১০ ভাগ এবং ভারতের মাত্র এক ভাগ বাণিজ্য                  হচ্ছে আঞ্চলিক বাণিজ্য। পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার ৫০ ভাগ বাণিজ্য হচ্ছে আঞ্চলিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি করার মধ্যেমে এই রপ্তানি আরো বাড়ানো সম্ভব। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দেশের নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি ২৯৭ শতাংশ (প্রায় তিন গুণ) এবং ভারতের রপ্তানি বাড়তে পারে ১৭২ শতাংশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টিমবন উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণে ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কৌশলগত প্রবেশদ্বারে পরিণত হতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজের হাবে পরিণত হতে পারে।

ট্রানজিট এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউজও হতে পারে। তবে গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই বাণিজ্যের আকার ১০ বিলিয়ন ডলার হলেও সম্ভাবনা রয়েছে আরো বেশি।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার কারণে সীমান্তে সময় বেশি লাগছে। পেট্রাপোল-বেনাপোল দিয়ে বেশির ভাগ আমদানি পণ্য বাংলাদেশে সড়কপথে ঢুকছে। কখনো কয়েক দিন পার হয়ে যায় এই সীমান্ত দিয়ে পণ্য আসতে। অথচ এ পরিমাণ পণ্য পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে মাত্র ছয় ঘণ্টায় পার হচ্ছে।

ভারতের কান্ট্রি ডিরেক্টর জুনায়েদ আহমেদ বলেন, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। শুধু সড়ক যোগাযোগই নয়, রেল, নৌ-যোগাযোগ, আঞ্চলিক বিদ্যুত্ যোগাযোগেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে আসন্ন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর ঐতিহাসিক হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় দুই দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার প্রশংসা করেন তিনি। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে যখন মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট হয়, তখন রাজনীতি এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, এটা প্রশংসনীয়। তিনি আরো বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। অশুল্ক বাধা দূর করার মাধ্যমে বাণিজ্যে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক নানাভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামোই নয়, দক্ষতা বাড়াতেও উদ্যোগ রয়েছে। ভারতের অংশে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিভিন্ন প্রকল্পে ২১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ রয়েছে বিশ্বব্যাংকের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে ভারতের শিলিগুড়ি থেকে একটি পণ্যবাহী ট্রাককে কলকাতা বন্দরে পৌঁছাতে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবহার করা যায় সেক্ষেত্রে এই পণ্য পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে মাত্র ৪৫০ কিলোমিটার পথ। যদি ভারতীয় ট্রাকের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত উন্মুক্ত থাকে সেক্ষেত্রে আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে মাত্র ২০০ কিলোমিটার পথ। পরিবহন খরচ কমে যাবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, দুই দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে বাংলাদেশের সব অঞ্চলই উপকৃত হবে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম এবং ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত আয় বেড়ে যাবে। তাছাড়া ভারতের উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্রও এর ফলে উপকৃত হবে। তবে এই অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলোকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে ২০১৫ সালে সম্পাদিত বিবিআইএন মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট আরো সংহত করতে হবে।