অণুগল্প

কাচ বউ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২১, ০০:১৫

 

যেন সাত সমুদ্র তেরো নদী (কিংবা আরো বেশি নদী) সাঁতরে এসেছে বউ আমার। তবু ক্লান্তির কোনো শিশির বিন্দু নেই ওর কারুময় ঠোঁটে, নাকের ডগায় অথবা কপালের বিছানো ত্বকে। আমি মুগ্ধ হয়ে ওর সৌন্দর্যে ডুব দিই। কিছুক্ষণ পর আনন্দ বারতা ঘোষণা করার মতো নাটকীয় ভঙ্গিতে বলি: তুমি, তুমিই জগতের সেরা সুন্দরীতমা। বউ হাসলে টোল পরা গাল দেখে আমার অনুরাগ বলকে ওঠে। টোলে ঠোঁট রাখতেই ওর লাজুক হাসি গড়িয়ে পড়ে কানের লতি চুঁইয়ে বুকের অলিন্দে। স্পষ্ট টের পাই নিতু আমার দেয়া Dior পারফিউম মেখেছে। আমার ইন্দ্রিয় ভীষণ তীক্ষ। টোলের আকর্ষণ (নইলে ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না) অগ্রাহ্য করে মুখোমুখি বসি। ওর ভেজা চুল থেকে শিশির কণার মতো জল গড়াচ্ছে। মাত্রই সাওয়ার নিয়েছে। আমি  জানি গোসল সেরে  কাজে বেরোবার আগে নিতু সুগন্ধি মাখে। সারা দিন বাইরে থাকবে, রোদ, গরম! বিয়ের পরপরই আমি বুঝে গেছি ওর সুবাসপ্রীতি একটু বেশিই। আমার দেয়া ফরাসি সুগন্ধি পেয়ে ও খুব খুশি। ফ্রেঞ্চ লেখা ‘EAU DE PARFUM’-এর বোতলটা আমার নাকের ডগায় দোলাতে দোলাতে ফিসফিস করে বলেছে, থ্যাঙ্ক ইউ! ওর ছেলেমানুষি দেখেও ভালো লাগে। আমার দেয়া ডায়মন্ডের দুল বা আংটি পেয়েও এত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখিনি ওকে। বউটা মনে হয় লোভী নয়। ভাবনাটা স্বস্তি দেয়।

আমাদের বিয়ের বয়স মাত্র তিন মাস। এখনো ওকে মুখস্থ হয়নি আমার। আমার লাঞ্চ আর ওর ডিনার প্রায় কাছাকাছি সময়ে। সময়টা এভাবে গুছিয়ে নিয়েছি আমরা। একসঙ্গে খেতে বসি। ওর পাতের সর্ষে ইলিশের গন্ধ উড়ে আসে নাকে। ওকে আমি সসেজ ভরা হট ডগের প্রেগন্যান্ট পেট দেখাই: এক কামড় খাও, মজা পাবে।

বউ নাক সিঁটকায়: দুপুরে একটু ভাত খেলে তো পার!

আমি হা করি, তাহলে একটু ইলিশের পেটি দাও কাঁটা বেছে।

বউ এবার কিন্তু হাসে না। ওর কি মন খারাপ করে দিলাম! মন খারাপ দেখে পুলক লাগে, কত ভালোবাসা আমার জন্য। নাহ কলেস্টরলের জন্য না, আপাতত প্রিয় এই বাঙালি খাবারটা খাওয়ার কোনো উপায় নেই আমার। যাক তবু তো খাওয়ার সময় দুজন দুজনের সঙ্গ পাচ্ছি!

এরপর আমরা ব্যস্ততার জালে আটকে পড়ি। টানা দুদিন ভার্চুয়ালিও আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি।  ও অফিসের কাজে ট্যুরে। সেখানে নেটওয়ার্ক নাই। ফোনে আমি কথা বলি। কিন্তু  ভিডিও চ্যাটে ওর দেখা না পেয়ে মন ভরে না। বিমর্ষ লাগে। ফোনের রিংটোন কানে চৌরাশিয়ার বাঁশির ধুনের মতো আছড়ে পড়ে। সবুজ একটা ধানখেত তার চেয়েও সবুজ একটা মুখ। প্রিয় নিতু! ও আমার বিকেলকে মধুর করে তোলে: শোন নেটওয়ার্ক দুর্বল এখানে। তাই আমি এমবি কিনে নিয়েছি। তোমার সঙ্গে কথা না বলে থাকা যায় বলো!

ইচ্ছে করে ওকে জড়িয়ে জমে থাকা সমস্ত আদর ঢেলে দিতে। তা তো হবার জো নেই। বলি: তো সুন্দরী বউ আমার, ধানখেতে কী কর?

ও দূরের একটা ট্রাক্টর দেখায়: ফিল্ডওয়ার্ক দেখতে  এসেছি। গত মাসে ধান চাষের যে ট্রেনিংটা এদের দেয়া হয়েছে সেভাবে কৃষক ভায়েরা কাজ করছে কি না ফলোআপে এসেছিলাম।

নিতু অ্যাগ্রি ইঞ্জিনিয়ার। কাজ করে একটা ইন্টারন্যাশনাল এনজিওতে। খেতের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলে: দুদিন আমাকে দেখতে না পেয়ে মন খারাপ, তাই তো? এসো, তোমার মন ভালো করে দিই। এক মিনিট অপেক্ষা কর। তারপর ও বেশ কিছুটা হেঁটে একটা আমগাছের ছায়ায় বসে বলে: চোখ বন্ধ করে শুধু শোন—‘দাঁড়াও আমার আঁখিরও আগে...’ ওর মিঠাস সুরে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারি না। আরে! ও কী করে জানল রবি ঠাকুরের এ গানটা আমার খুব খুব পছন্দের?   

এত গুণ মেয়েটার! বড়পা যখন আমার জন্য মেয়ে পছন্দ করে জানাল—অপু, তোর জন্য রাজকন্যা ঠিক করেছি।    আমি চোখ বন্ধ  করে রাজি হয়ে যাই। বড়পার পছন্দ বলে কথা! নিতু দেখতে যেমন মিষ্টি মনও তেমন উদার।

তারপর দেশে যাবার জোর প্রস্তুতি শুরু করি। ওহ হো, বলাই হয়নি; চাকরি সুবাদে আমি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থাকি। কিছু জটিলতার জন্য আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বিয়েটা ভার্চুয়ালি হয়। ভিডিও কলে। তারপর মাস তিনেক চলে গেছে। নিতু কাচ বউ হলে কী হয়, ওকে আমি নিখাঁদ ভালোবাসায় আপন করে নিয়েছি। সামনের সপ্তাহে আমি দেশে যাচ্ছি। কাচের ভেতর থেকে ওকে মুক্ত করতে হবে না!

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য