মশা রক্ত খাইবে, ভালো কথা; কিন্তু ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়ার মতো রোগ কেন ছড়াইবে? ইহা লইয়া কৌতুক চালু রহিয়াছে যে, মশারা শুধু কি লইয়াই যাইবে, কিছু দিবে না? মশারা মানুষের মতো অকৃতজ্ঞ নহে! আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় লইয়া ব্যাপক মতবিরোধ থাকিলেও মশার অত্যাচারের ব্যাপারে কাহারো কোনো দ্বিমত নাই। রাজধানীতে সম্প্রতি ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়া গিয়াছে কিউলেক্স মশার ঘনত্ব। এই মশা কামড়াইলে ডেঙ্গুর মতো রোগ হইবার ভয় না থাকিলেও বিরক্তিকর অত্যাচারের নিক্তিতে কিউলেক্স মশার তুলনা চলে না। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের চাইতে অধিক বৃষ্টি হইবার কারণে ডোবানালা, খালের বদ্ধ পানিতে কিউলেক্স মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হইয়াছে। আর তাহার ফলে কিউলেক্স মশা এখন পঙ্গপালের মতো রাজধানী জুড়িয়া নৃত্য করিতেছে। অনেকের মতে, সন্ধ্যার পর কোথাও কোথাও কিউলেক্স মশা এত অধিক দেখা যায় যে, কেহ যদি তখন বাতাসে হাত দিয়া মশা ধরিতে চাহে, তাহা হইলে দেখা যাইবে শতসহস্র মশায় তাহার হাত ভর্তি হইয়া গিয়াছে। যদিও চৈত্র মাসে ঘনঘন ছোট-বড় ঝড়বৃষ্টি হইলে প্রাকৃতিকভাবেই কিউলেক্স মশা কমিয়া গিয়া থাকে; কিন্তু সেই আশায় না থাকিয়া সিটি করপোরেশন দ্রুত মশক নিধন কর্মসূচি লইয়াছে বটে। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মেয়র জানাইয়াছেন যে—মশা মারিতে ঔষধের যেই ডোজ দেওয়া হইতেছে তাহাতে অনেকাংশেই মশা মরিতেছে না।
বিপদ বটে। তবে ইহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। কারণ, নির্দিষ্ট কোনো একটি কীটনাশক একটানা পাঁচ বত্সরের অধিক সময় ধরিয়া ব্যবহার করা হইলে মশা সেই কীটনাশকের বিপক্ষে সহনশীলতা তৈরি করিয়া ফেলে। অর্থাত্ ঔষধ মশা নিধনে আর কাজে লাগে না। ইহা মশার একটি জেনেটিক মেকানিজম। প্রকৃত অর্থে, পৃথিবীর অত্যন্ত আদিবাসিন্দা এই মশক প্রজাতি। কত লক্ষকোটি বার পশ্চিমাকাশে সূর্য পাটে গেল, কত সহস্র লক্ষ প্রজাতি পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইয়া গেল; কিন্তু মশককুল প্রতাপের সহিত পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি বত্সর ধরিয়া টিকিয়া রহিল। কেবল তাহাই নহে, এই পৃথিবীতে মানুষ যেই সকল রোগের কারণে সবচাইতে বেশি মারা গিয়াছে, তাহার মধ্যে মশাবাহিত রোগ হইল নাম্বার ওয়ান কিলার। মানবহত্যার পরিসংখ্যানে বাঘ, সিংহ কিংবা সাপ বা অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী নহে, মশা হইল মানুষের জন্য সবচাইতে ভয়ংকর প্রাণী। ইতিহাস বলে, মশার কারণে ইতিহাসের অনেক বাঁক বদল হইয়াছে। জানা গিয়াছে, বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশা রহিয়াছে। আর রাজধানী ঢাকা শহরে রহিয়াছে ১৩ প্রজাতির মশা। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় সকল মেয়রই নানান সমস্যায় বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়িয়াছেন। ফগার মেশিন দিয়া সময়ে সময়ে ধোঁয়া দেওয়া হয়, নিয়ম করিয়া ড্রেনে ঔষধ ছিটানো হয়; কিন্তু মশা তো সহজে কমে না। সমস্যা হইল, রাজধানীতে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার বক্সকালভার্ট ও কাভার্ড ড্রেন রহিয়াছে, যেইগুলিতে দুই সিটি মশার ঔষধ ছিটাইতে পারে না। আর প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী, পলিথিন, ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন আবর্জনায় এই ড্রেনগুলি ভরাট থাকে। যেই কারণে ড্রেন দিয়া পানি নিষ্কাশন হয় না। জমিয়া থাকা এই সকল পানিতেও কিউলেক্স ভয়াবহরূপে বংশ বিস্তার করিয়া থাকে।
আশার কথা হইল, ঢাকার দুই মেয়র পূর্বের তুলনায় মশা নিধনে অনেক অধিক সচেতন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মেয়র জানাইয়াছেন, সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ২০০ কর্মী একযোগে এই প্রোগ্রামে ঔষধ ছিটানোর কাজ করিতেছেন; কিন্তু মশার ঔষধ যদি কাজই না করে, তাহা হইলে কী হইবে? ইহার জন্য কীটতত্ত্ববিদদের বিশেষ পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ইহা ছাড়া স্থায়ীভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে আনিতে হইলে সারা বত্সর ধরিয়াই সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করিতে হইবে।
