সামরিক বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) ও নিরাপত্তা বাহিনীর (পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং আনসার ও ভিডিপি) কার্যপরিধি আলাদা হলেও এরা সবাই রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য এবং একে অপরের পরিপূরক। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় এবং দুর্যোগকালীন সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার গুরুদায়িত্ব পালন করছে দেশের পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ও সংস্থা। পুলিশ বাহিনী দেশের বিদ্যমান আইনের রক্ষক এবং সাংবিধানিকভাবে তাদের রয়েছে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগের আইনি অধিকার। দেশের সব বাহিনীই তাদের নিজস্ব আইন দ্বারা পরিচালিত এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য আইনি কাঠামোতে আবদ্ধ। স্বাধীনতাযুদ্ধে এসব বাহিনীর সদস্যরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্য দিয়ে তাদের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের প্রমাণ রেখে চলছে; পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য, সহযোগিতাপূর্ণ সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি রক্ষা করে চলেছে। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী একই সুতায় গাঁথা। তাদের মধ্যকার চমত্কার সুসম্পর্ক, যুগপত্ রণকৌশল এবং সম্মিলিত শক্তিই দেশের প্রতিরক্ষাব্যূহ।
সামরিক ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন বাহিনীতে প্রেষণে নিয়োজিত থাকায় ঐ সব বাহিনী বিশেষ করে বিজিবি, র্যাব, আনসার ও ভিডিপির সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে চমত্কার বোঝাপড়া, বাহিনীসমূহের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে; তারা চৌকশ ও শক্তিশালী হয়েছে; যুদ্ধকালীন সফলতার জন্য এবং শান্তিকালীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে যা অত্যন্ত সহায়ক। তাছাড়া দেশের সব বাহিনী একে অপরের প্রয়োজনে মিলেমিশে কাজ করে, নিজেদের মধ্যে প্রশিক্ষণ বিনিময়, একত্রে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন, ভিআইপি নিরাপত্তা প্রদান, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন, জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন জাতীয় ও বাহিনী পর্যায়ে খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে থাকে। র্যাব-পুলিশ কর্তৃক অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত ও বাহিনীগত আইনি সহায়তা প্রদান করে। একইভাবে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সামরিক বাহিনী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি হিসেবে নিরাপত্তা সহায়তা ও নির্বাচনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে।
সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সবাই সুপ্রশিক্ষিত। তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, ক্ষমতার পরিসীমা, তাদের করণীয়, বর্জনীয়, দণ্ডনীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে সব সদস্যই অবগত। জনসাধারণের সঙ্গে, বাহিনীসমূহের সদস্যদের সঙ্গে, এক বাহিনীর সঙ্গে অন্য বাহিনীর সদস্যদের আচরণ কেমন হবে তা-ও উল্লেখ আছে। যেমন—জনসাধারণের প্রতি পুলিশ সদস্যদের আচরণ কেমন হবে, সে সম্পর্কে ‘পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) ৩৩’-এ সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আবার বাহিনীসমূহের মধ্যে যদি কোনো কারণে বা অপরাধে সামরিক সদস্য, পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয় এবং পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত হলে ‘পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) ৩১৯’ অনুযায়ী উক্ত সামরিক সদস্যের কর্মরত ইউনিটের অধিনায়ককে দ্রুত অবগত করবেন। এক্ষেত্রে নিকটস্থ মিলিটারি পুলিশকেও অবহিত করতে পারেন। যদি কোনো কারণে উক্ত সামরিক সদস্যকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে ‘ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) ধারা ৫৪৯’ মোতাবেক ধর্ষণ, খুন ও প্ররোচিত হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রে নিজ নিজ বাহিনীর প্রযোজ্য আইনে বিচারকার্যের নিমিত্তে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ঘটনা/অপরাধের বিবরণ সংবলিত প্রতিবেদনসহ তার অধিনায়কের কাছ ফেরত পাঠাবেন। পুলিশ সদস্য কর্তৃক যদি কেউ নির্যাতিত হন, তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য তাদের জন্য প্রযোজ্য আইনের ধারায় দণ্ডিত হতে পারেন। শুধু সামরিক বাহিনীই নয়, অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রেও রয়েছে আইনি সুরক্ষা। বাহিনীর একজন সদস্য কখনো অন্য বাহিনীর সদস্য দ্বারা কিংবা অন্য কারো দ্বারা নিগৃহীত হলে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজ বাহিনীর ঊর্ধ্বতনের মাধ্যমে এর সুবিচার প্রত্যাশা করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও সুবিচার নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে বাহিনীসমূহ নিজেরাই নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় সর্বদা সতর্ক থাকে। কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয় কঠোর আইনি ব্যবস্থা। ক্ষমতার অপব্যবহার করতে গিয়ে বড় বিপত্তি বাধিয়ে ফেললে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায়, সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বা গুটি কয়েক সদস্যের কর্মকাণ্ড বাহিনীর ইমেজকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই কোনো বাহিনীর সদস্যের অপরাধের দায় ঐ সদস্যকেই নিতে হয় এবং বাহিনীর সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা আরো একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতির বন্ধন শুধু বাহিনীর চাকরিরতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বাহিনীসমূহের মধ্যে চাকরিরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সবাই একই সুতায় গাঁথা। অবসরপ্রাপ্তরা চাকরিরতদের অগ্রজ, যাদের কারণে বর্তমানরা দাঁড়িয়ে আছে, তারা গুরুজন-গুণীজন, তাদের সম্মানও নিশ্চিত করতে হয়; সেই শিক্ষাই বাহিনীর সবাই ধারণ করেন। কোনো বাহিনীর চাকরিরত সদস্য দ্বারা অন্য বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য নিগৃহীত হলে তা-ও বাহিনীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই অবসরপ্রাপ্তদের সম্মান, তাদের নিরাপত্তা, চিকিত্সা-সহায়তা, সর্বোপরি তাদের সুখ-দুঃখ দেখা নিজ নিজ বাহিনীর দায়িত্ব।
তাছাড়া, বাহিনীসমূহের মধ্যকার বিদ্যমন সুসম্পর্ক সর্বদা সযত্নে লালন করতে হয়। সম্প্রীতি ও সৌহার্দের সুদৃঢ় বন্ধন অটুট রাখতে বাহিনী-বাহিনীর মধ্যে, ঊর্ধ্বতন-অধস্তনের মধ্যে, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। এক বাহিনীর সদস্যের সঙ্গে অন্য বাহিনীর সদস্যের সংঘটিত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা অপরাধ সংঘটিত হলে, সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে ঘটনা সঠিকভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। তাছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক, আচরণ ও শিষ্টাচারের ওপর নিজ নিজ বাহিনী কর্তৃক নিয়মিত প্রেষণামূলক ক্লাস পরিচালনা করা, এক বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য আইন সম্পর্কে অন্য বাহিনীর সদস্যদের অবগত রাখা এবং বাহিনীসমূহের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হয়। একে অপরের ভালো অনুশীলনগুলো গ্রহণ করা, প্রশিক্ষণ বিনিময়, সমন্বয়, সহযোগিতার জায়গাগুলো উন্মুক্ত রাখতে হয়। এতে সব বাহিনীই উপকৃত হয় এবং ঊর্ধ্বতন-অধস্তনের ইতিবাচক মনোভাব বাহিনীসমূহের মধ্যকার বিরাজমান সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে। মনে রাখতে হবে, পারস্পরিক সুসম্পর্ক, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাহিনীসমূহের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং এদের সদস্যদের মনোবল অটুট রাখে।
n লেখক :প্রাক্তন মিলিটারি পুলিশ কর্মকর্তা
