১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (১১ মার্চ)

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ১৭:০৫

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার মূল খবরের শিরোনাম ছিল, ‘জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বের ওখানেই শেষ নয়...’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য এটি। জাতিসংঘের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল উ থানত বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘ কর্মচারীদের অপসারণের অনুমতি দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বঙ্গবন্ধু আগের দিন (১০ মার্চ) এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর লোকেরা বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশিদের জীবন ও ধন-সম্পত্তি কতখানি বিপন্ন করে তুলেছেন সেক্রেটারি জেনারেলের এই কার্যক্রমে সেটাই প্রমাণ করে। সেক্রেটারি জেনারেলের বোঝা উচিত, কেবল জাতিসংঘ কর্মচারীদের অপসারণ করলেই এ ব্যাপারে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেননা যে হুমকি আজ উদ্যত হয়েছে তা গণহত্যার হুমকি। সেই হুমকি বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য জাতিসংঘ সনদের সংরক্ষিত মৌলিক মানবাধিকার অস্বীকৃতিরই নামান্তর।’

জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই আজ শেষ কথা। যারা মনে করেছিলেন- শক্তির দাপটে আমাদের ওপর তাদের মত চাপিয়ে দেবেন, বিশ্বের দরবারে তাদের চেহারা আজ নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। বিশ্ব জনমতের কাছে কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের সৎচিন্তাশীল মানুষের কাছে তারা বাংলার নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর শক্তির নগ্ন প্রয়োগের যুক্তি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। তবুও বিবেকবর্জিত সেই গণবিরোধী শক্তি নিজেদের বেপরোয়া পথই সমানে অনুসরণ করে যাচ্ছেন। তাদের সমরসজ্জা সমানে অব্যাহত। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন সামরিক বাহিনীর লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র আনা হচ্ছে। রাজশাহী ও রংপুরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। বিনাশী শক্তির এই সমাবেশ ঘটিয়েও তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় নাই। তাই ক্ষমতাসীন চক্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মারণাঘাত হানার চক্রান্তে মেতেছেন। সর্বত্র এক ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে বিদেশি বিশেষজ্ঞদেরও তারা ভীত-সন্ত্রস্ত করে বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য করছেন। সামরিক সজ্জা অব্যাহত রেখে বাংলার বুকে তারা এক জরুরি অবস্থা কায়েম রাখতে প্রয়াসী। ধ্বংসকারীরা যত অস্ত্রেই সজ্জিত থাকুক না কেনো, কোনো শক্তিই আর বাংলাদেশের আপামর মানুষকে চূড়ান্ত বিজয় থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।’

১৯৭১ সালের ১১ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা’ শিরোনামের একটি খবরে নিউইয়ের্ক প্রবাসী বাঙালিদের বিক্ষোভের কথা উঠে আসে। নিউইয়ের্ক প্রবাসী পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা ১০ মার্চ জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে বিক্ষোভ করেন। নিরস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানিদের হত্যার প্রতিবাদে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের দাবিতে বিভিন্ন ধ্বনি দেন তারা। পরে বিক্ষোভকারীদের নেতারা জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উ থানতের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন।

‘অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে গিয়া শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ করুন’ শিরোনামের খবরে তুলে ধরা হয় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানার আহ্বারে। লাহোর থেকে ১০ মার্চ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে যেমন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন, ঠিক সেভাবেই শেখ মুজিবের সঙ্গে সব ব্যাপারে তার বিস্তারিত ও অন্তরঙ্গভাবে আলোচনা করা উচিত।’

‘শেখ মুজিবের নির্দেশ মানিয়া চলার সিদ্ধান্ত’ শিরোনামের খবরে জানানো হয়, বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা (সার্কেল অফিসার উন্নয়ন ও রাজস্ব) আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় এর পাশেই আরেকটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘চূড়ায় চূড়ায় কালো পতাকা’। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধিকার আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির তৃতীয় দিন ছিল ১০ মার্চ। এদিনও রাজধানীর সব বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, বাসভবন এমনকি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বাসভবন এবং রাজারবাগ এলাকায় অবস্থিত পুলিশ বিভাগের অফিসগুলোর শীর্ষে কালো পতাকা উড়েছে। রাজধানী ঢাকার সব সরকারি, আধা-সরকারি বিভাগের কর্মচারীরা অফিসে যোগদান থেকে বিরত থাকেন ১০ মার্চ। 

ইত্তেফাক/জেএইচ