প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২১:৪৯

বর্তমানে নারীরা প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন শাখায় অবস্থান করে নিচ্ছে। সরকার নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়েছে। এটা সত্য, কিন্তু মাত্র হাতেগোনা কয়েক জনের কথা বাদ দিলে সমাজের কাছে নারীর অবস্থান কিন্তু এখনো উন্নত হয়নি। জন্মের পর থেকেই মেয়েদের জীবনযাপন নির্ভর করে সমাজের আরোপিত নিয়মের নিগড়ে। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, তাই তারা নিয়ম করেছে তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে। নারীশিক্ষা লাভ করেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছে, আর রোজগার করছে।  নারী নির্যাতন ও তার প্রতিকার, নারীর সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনার কমতি নেই কিন্তু মূলত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এখনো অনেক পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম আনন্দ দেয় না। কন্যাসন্তানের নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার ভয়ে পরিবারই সমাজের ভয়ে কন্যাসন্তানের পায়ে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে দেয়। তার ফলেই কন্যাসন্তান বড় হয় পরনির্ভরশীল হয়ে। কন্যাসন্তানকে মানতে বাধ্য করা হয় তারা পুরুষের মতো নয়, তারা মানুষ নয়, তারা ‘মেয়ে’। শিক্ষিত বাবা-মা ও অধিকাংশ সময় সমাজের ভয়ে বাধ্য হয়ে মেয়ের স্বাধীনতা হরণ করে সামাজিক শেকল পরিয়ে দেয়। অপরপক্ষে ছেলেসন্তানের জন্মে পরিবারে আনন্দের কূলকিনারা থাকে না। তাকে দেওয়া হয় সব ধরনের স্বাধীনতা। কারণ ‘ছেলে সন্তান’ মানে ‘বংশের প্রদীপ’। তারা বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু এই ছেলে সন্তান যখন স্বাধীনতার অপব্যবহার করে সমাজে কুকর্মে জড়িয়ে পড়ে, ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করে তখন আপনাদের বংশের প্রদীপের ঝলকানিটা কোথায় যায়? কন্যাসন্তান বৈষম্যের স্বীকার হয় পৈতৃক সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রেও। একই পিতামাতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাকে বঞ্চিত করা হয় সমানাধিকার থেকে। উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংখ্যা ইউএন ওমেন ২০১৫-২০১৬ : ‘ট্রান্সফর্মিং  ইকোনমিকস’, ‘রিয়েলাইজিং রাইটস’ নামের প্রতিবেদনটিতে বলেছে, নারীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন।

 সমাজ মানে আমি, আপনি, আমরা সবাই। সমাজের নিয়ম মানে আমাদের নিয়ম। আমাদের সমাজে দিনের বেলায় নারীকে নারী বলে হয়তো সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন অনেকে। তবে কেন সন্ধ্যার পর এত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে নারীদের জন্য?  একশ্রেণির পুরুষ ভুলে যান কেন তারা নারীর শরীর শকুনের দৃষ্টিতে ক্ষতবিক্ষত করছেন।  এই নারীরা তো আপনার মতোই কোনো পুরুষের কন্যা, মা বা বোন। সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারীরা আজ শিক্ষিত হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই  কেন নারীদের? অনেক কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে লাঞ্ছিত হতে হয় নারীদেরকে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষিত অনেক পুরুষেরা আবার স্ত্রীদের চাকরি করা পছন্দ করেন না। তারা মনে করেন, এটা নিরাপদ না।

 স্ত্রী পড়াশোনা জানা শিক্ষিত হলেও সে জ্ঞান কাজে লাগান গৃহস্থালির কাজে, সন্তান পালনের কাজে; কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সুগম না বলে তারা মনে করেন। তাদের কাছে একটা প্রশ্ন—যদি এতই বোকা যে অনিরাপদ দুর্গম পথ, তাহলে কেন আপনারা আপনাদের নারী সহকর্মীদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করেন? আপনারা নিজেরাই নারী সহকর্মীদের উত্ত্যক্ত করবেন আবার নিজেরা নিজের স্ত্রীকে নিরাপত্তার অভাবে চাকরি করতে দিতে চাইবেন না। পরস্পরবিরোধী মতবাদ দিয়ে অনেক নারীবাদী পুরুষেরা কথা বলেন।

 আমাদের সমাজে ‘মেয়েছেলে’ শব্দটা বহুল ব্যবহূত। এটার মানে কী? অর্ধেক ছেলে আর অর্ধেক মেয়ে? এটা ব্যবহার করা হয় তাচ্ছিল্য প্রকাশে। নারীকে কিন্তু অযোগ্য মনে করে এ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। যে দেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, শিক্ষামন্ত্রী নারী, যে দেশে ক্ষমতাসীন পদে নারীরা রয়েছেন সে দেশ কেন এখনো নারীদের জন্য অনিরাপদ? ধর্ষণ করে পুরুষেরা, কিন্তু সারা জীবন নারীকেই ভোগ করতে হয় লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। ধর্ষিতা নারীকেই যেন বাকি জীবন ভরে মেটাতে হয় পুরুষের পাপের শাস্তি!

 বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌতুক প্রথা এখনো পিছু ছাড়েনি। আমাদের সমাজের নারীকে এক্ষেত্রেও সহ্য করতে হয় নির্যাতন। নারী কর্মজীবী হলেও মেলে না পূর্ণ স্বাধীনতা। বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমাদের সমাজ সতী নারীকেই প্রাধান্য দেয়। পরিবারের অভিভাবকরা কি কখনো কোনো ধর্ষিতা নারীকে পুত্রবধূ করতে রাজি হবেন? হবেন না। সমাজে নারীর স্বাধীনতা নেই নিজের বৈবাহিক অবস্থা নিয়েও। কোনো মেয়ে বিয়ে না করে সমাজে টিকতে পারবে না, তাকে প্রতিনিয়ত শিকার হতে হবে লাঞ্ছনার। তাতে প্রমাণিত হয় ‘তুমি সিঙ্গেল এটাই সমস্যা’। অর্থাত্ বিয়ে করার সিদ্ধান্ত সমাজ চাপিয়ে দেবে নারীদের ওপর, কোনোভাবে তাকে অবিবাহিত থাকা যাবে না। আবার এ নারী যদি একাধিক বিয়ে করে তাহলে তো তার চরিত্র নিয়ে নোংরা উপন্যাস শুরু হবে। কোনো নারীকে বিয়ে করতে হলে তো তাকে আবার সারা জীবন স্বামীর সব দোষত্রুটি মেনে থাকতে হবে। নারী যদি ডিভোর্সি হয়, তবে সমাজের কিন্তু ভুল হবে না তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। সিঙ্গেল নারীকে ভোগ করতে হয় বিভিন্ন সামাজিক নির্যাতন। শিশুকেও ভোগ করতে হয় নানা যন্ত্রণা, পিতার পরিচয় সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো সন্তানের পিতা ধর্ষক হয়, তবে তার পরিচয়ে কি সেই সন্তানের মুখ উজ্জ্বল হবে? আমাদের সমাজে ছোটখাটো পরিবর্তন এনে মেয়েদের কিছু সুবিধা হয়েছে কিন্তু মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি। দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি সমাজের সিংহভাগের। চার দেওয়ালের বাইরে নারীদের স্বাধীন চলাফেরা সমাজ যেন মেনে নিতে পারেনি মন থেকে। দেশে নারী নির্যাতন রোধে প্রয়োজনীয় আইন আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা থাকলেও অনেক আসামি গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু নারী নির্যাতন উল্লেখযোগ্য হারে কমছে না। সে কারণে নারী নির্যাতন এখন দেশের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। সমাজে নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে না তুললে শুধু আইনি তত্পরতা দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমাজ প্রায়ই নিশ্চুপ থাকে। জাতিগতভাবেই আমরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন।

 এদেশের নারীরা বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা পারে সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে। তারা এভারেস্ট জয় করতে পারে, তারা দেশ চালাতে পারে। শুধু অপসারণ করা দরকার পথের বাধাগুলোকে। নারীরা প্রমাণ করেছিল তারা প্রয়োজনে কোমল হাতে তুলে নিতে পারে অস্ত্র। অপশক্তির বিরুদ্ধে নারীরা যুদ্ধ করেছিল এবং সফল হয়েছিল। বর্তমান সমাজে বিদ্যমান অশান্তির বিরুদ্ধে নারীকে সোচ্চার হতে হবে। পাশাপাশি নারী নির্যাতন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে কুচক্রী মহলকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। নারী ক্ষমতায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক রক্ষণশীল মানসিকতাকে পরিবর্তন করার জন্য দেশব্যাপী সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

n লেখক : সমাজকর্মী