কোম্পানীগঞ্জে আতঙ্ক চলছে গ্রেফতার

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২২:৪৮

নোয়াখালীর কোম্পানীঞ্জের বসুরহাটে গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়েছে। বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার প্রতিপক্ষ এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলকে প্রথমে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে পরে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এছাড়া আরো প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নতুন করে যাতে সহিংসতার ঘটনা ঘটতে না পারে, সেজন্য মোতায়েন করা হয়েছে বাড়তি পুলিশ ও র্যাব। গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে টহল দিচ্ছে র্যাব ও পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পুরো এলাকায় থমথমে ভাব। স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা গত প্রায় আড়াই মাস ধরে নানামুখী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। যা পরবর্তীতে রক্তঝরা সংঘাত ও প্রাণহানিতে রূপ নেয়। এলাকায় মির্জা কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বাদল, যিনি ওবায়দুল কাদেরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে নোয়াখালীর প্রেস ক্লাব এলাকার একটি চা-দোকানের সামনে থেকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা মিজানুর রহমান বাদলকে একটি মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার দাবি করে। পরে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলমগীর হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, বাদলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যেখান থেকে বাদলকে তুলে নেওয়া হয় সেখানকার লোকজন জানান, বাদল কয়েক জন নেতাকর্মীসহ প্রেস ক্লাবের পশ্চিম পাশের রেডক্রিসেন্ট মার্কেটের একটি চা-দোকানে চা পান করছিলেন। এ সময় একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস এসে সেখানে দাঁড়ায়। এক মিনিট পরেই ঐ মাইক্রোবাস থেকে কয়েক জন বের হয়ে বাদলকে তুলে নেয়। এরপর মাইক্রোবাসটি জেলা জজ আদালতের সড়ক হয়ে পশ্চিম দিকে শহরের মূল সড়কের দিকে চলে যায়।

বাদলের ছোট ভাই রহিম উল্যাহ সাংবাদিকদের জানান, সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফেসবুকে মিজানুর রহমানের একটি পোস্ট পাওয়া গেছে। তাতে বাদল লিখেছেন, ‘সবাই ধৈর্য ধরুন। দেহে একবিন্দু রক্ত থাকতেও প্রিয় নেত্রী ও প্রিয় নেতার অপমান আমরা সইব না। কোম্পানীগঞ্জকে অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত করব ইনশাআল্লাহ। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেখা হবে মুক্ত কোম্পানীগঞ্জে।’

প্রসঙ্গত, ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানীগঞ্জের চাপরাশিরহাট বাজারে আবদুল কাদের মির্জা ও মিজানুর রহমান বাদল সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি মারা যান। এছাড়া গত ৯ মার্চ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভা চত্বরে উভয়পক্ষের মধ্যে পুনরায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঐ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আলউদ্দিন নামের এক সিএনজিচালক মারা যান।

একাধিক মামলা :মঙ্গলবারের সংঘাতে নিহত সিএনজি চালক আলাউদ্দিনের পিতা মমিনুল হক বাদী হয়ে আবদুল কাদের মির্জা ও তার ভাই শাহাদত্ হোসেনসহ ১৬৮ জনের বিরুদ্ধে গতকাল কোম্পানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফুর রহমান বাদী হয়ে খিজির হায়াত খানকে প্রধান আসামি ও মিজানুর রহমান বাদলসহ ৯৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে বুধবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন। সোমবার বিকালে বসুরহাট রূপালী চত্বরে আবদুল কাদের মির্জার ব্যক্তিগত অফিস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছবি এবং বঙ্গবন্ধু শতবর্ষ উদ্যাপন মঞ্চ ভাঙচুরের ঘটনায় এ মামলা দায়ের করা হয়।

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার রাতে বসুরহাট পৌরসভায় মেয়রের কার্যালয়ে হামলা, গুলি, ভাঙচুরের ঘটনায় গতকাল দুপুরে পৌর কর্মচারী মো. স্বপন বাদী হয়ে ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে কোম্পানীগঞ্জ থানায় আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

জড়িত কাউকেই ছাড় নয় :ওবায়দুল কাদের

গতকাল জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, নোয়াখালীতে কিছু দিন ধরে যে বিশৃঙ্খলা চলছিল, সে বিশৃঙ্খলার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে অভিযান শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারাই জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

ওবায়দুল কাদের তার সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে আরো বলেন, দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে অত্যন্ত কঠিন অবস্থানে? দলের শৃঙ্খলা না মানলে যত বড় নেতা বা জনপ্রতিনিধি হোন না কেন, দল ছাড় দেবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযান অব্যাহত আছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ত্যাগীদের দলের কমিটিতে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ত্যাগীরা আওয়ামী লীগের প্রাণ, তাদের কমিটিতে রাখতে হবে। পকেট ভারী করার জন্য বসন্তের কোকিলদের দলে না টানতে জেলা ও উপজেলার নেতৃবৃন্দের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

পরিস্থিতি এখনো থমথমে

কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটে জারি করা ১৪৪ ধারার সময় পার হলেও পরিস্থিতি এখনো থমথমে। ফের  যেন সেখানে সহিংসতার ঘটনা না ঘটে, সেজন্য মোতায়েন করা হয়েছে ৩০০ পুলিশ এবং ১৬ জন র্যাব সদস্য। জেলা পুলিশের পাশাপাশি রাঙ্গামাটি থেকে আনা হয়েছে ২০০ জন পুলিশ সদস্য। রয়েছেন পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। গতকাল সকাল থেকে বসুরহাটের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় অবস্থান নেন পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের একাধিক মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। টহল দিচ্ছেন র্যাবের সদস্যরাও। বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জাকে ১৫-২০ জন অনুসারী নিয়ে সকাল থেকে বিভিন্ন সড়কে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। জানা গেছে, বসুরহাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারার মেয়াদ বুধবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে ১৪৪ ধারা জারি না করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বসুরহাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা এবং টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল ১০টা নাগাদ শহরের কিছু কিছু দোকানপাট খুলেছে। পরিস্থিতি বুঝে হয়তো দোকানপাট আরো খুলবে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। তবে বসুরহাটে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকলেও বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটছে না।