পাঁচ প্রকল্প বাদ দেওয়ায় অনিশ্চিত চীনা ঋণের ৩৬০ কোটি ডলার

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২২:৫০

চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়নের তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকার পাঁচ প্রকল্প বাতিল করায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ৩৬০ কোটি ডলার ঋণ। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সমপরিমাণ অর্থে নতুন করে পাঁচ প্রকল্প অর্থায়ন তালিকায় নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও চীন এক্ষেত্রে অর্থায়নের নিশ্চয়তা দেয়নি।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হলে চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন প্রক্রিয়া করেই এসব প্রকল্প অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠাতে হবে। মানতে হবে নতুন কিছু নিয়ম। তাছাড়া নমনীয় সুদ মিলবে কি না সে নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। পাটকল আধুনিকায়নের প্রকল্প প্রত্যাহার করায় এ খাতে ভবিষ্যতে আর অর্থায়ন নাও হতে পারে বলে চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের পর ২৭টি প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। সেসময় ২০২০ সালের মধ্যে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করার লক্ষ্য থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে যায়। এসব প্রকল্পে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগ ধরা হয় প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার (১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা)।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণ, যোগাযোগ অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তিসহ নানা উন্নয়নকাজে এই অর্থ দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। এরমধ্যে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত জ্বালানি তেলের পাইপলাইন ও ‘মুরিং’ স্থাপন, জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে তৃতীয় ধাপের উন্নয়ন এবং টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নসহ মোট সাতটি প্রকল্পে অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে। তবে বাকি প্রকল্পগুলো অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদার নিয়োগ জটিলতাসহ নানা কারণে আটকে আছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘসূত্রতার কারণে পাঁচটি প্রকল্প বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন প্রস্তাব বাতিল করে নতুন পাঁচটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়।

বাতিল হওয়া পাঁচ প্রকল্পের মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে ২১১ কোটি ডলার (প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পটিতে সড়ক বিভাগের সচিবকে ঘুষ সাধার অভিযোগে চায়না হারবারকে কালো তালিকাভুক্ত করে বাংলাদেশ সরকার। ফলে এই প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন আর নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পটিতে ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে।

বড় পুকুরিয়া কয়লাখনির সম্প্রসারণে চীনা অর্থায়ন ধরা হয়েছিল ২৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার (প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা)। এছাড়া বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পে ৫২ কোটি ১৫ লাখ ডলার (৪ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা), মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুেকন্দ্র প্রকল্পে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার (৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা) এবং জুট মিল করপোরেশনের অধীনে সরকারি পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের প্রকল্পে ২৮ কোটি ডলার (২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা) চীনা অর্থায়নের প্রত্যাশা ছিল।

গত বছর জুলাই থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকলের উত্পাদন বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এগুলোকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর ফলে আধুনিকায়নের প্রকল্পটি বাতিল করে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জনা যায়, চীনের ঢাকা দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল কাউন্সিলর অফিস সম্প্রতি জানিয়েছে, পাঁচ প্রকল্পে ৩৬০ কোটি ডলার দেওয়ার কোনো অর্থায়ন চুক্তি করেনি চীন, তবে সমঝোতা হয়েছিল মাত্র। বাংলাদেশ সরকার এসব প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন বাতিলের প্রস্তাব করায় নতুন প্রকল্পে এই অর্থায়ন নিশ্চিত নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমপরিমাণ অর্থ পাবে কি না সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাব করা প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ মিলবে কি না সেটির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। কারণ, প্রত্যাহার করা পাঁচ প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল সেটি সমঝোতা স্বারকে উল্লেখ ছিল না। বর্তমানে চীনা অর্থায়নের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেটি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা থেকেও বেশি। তাই বড় প্রকল্পে নতুন করে অর্থায়ন করা চীনের পক্ষে কঠিন হবে। এজন্য চীনা সরকারের নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। কারণ বাতিল হওয়া প্রকল্পের মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার মতো প্রকল্প ছিল যেমন পাট কল আধুনিকায়নের প্রকল্প একটি। বিজেএমসি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে একটি চুক্তিও করেছিল। এতে চীনের কারিগরি সহায়তা করার লক্ষ্য ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আধুনিকায়নে চীনের আগ্রহও ছিল। এ প্রকল্পটি  বাংলাদশে সরকার একতরফা ভাবে বাদ দিয়েছে তাই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও তিক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে বস্ত্র ও পাট খাতের প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ আর নাও হতে পারে, এমনটি জানিয়েছে চীনা দূতাবাস। তাই বিকল্প উত্স থেকে পাট খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।

প্রকল্প বাদ দিয়ে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবের বিষয়ে কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বড় আকারে প্রকল্প না নিয়ে তুলনামূলক ছোট প্রকল্প প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। দূতাবাসের চিঠিতে বলা হয়েছে, উচ্চ হারে পরিবেশ দূষণ করে, বেশি জ্বালানি খরচ হয় এমন প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না চীন, যেমন কয়লা খনি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য তালিকায় থাকা ২৭ প্রকল্পের মধ্যে সাতটি প্রকল্পে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। এতে ৫৪০ কোটি ডলার (৪৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা) অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। ঐ সময় পর্যন্ত ছাড় হয়েছিল ১৬০ কোটি ডলার (১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা)।