অলস মস্তিষ্কে শয়তান বাসা বাঁধে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ২১:১০

একটি জনপ্রিয় বাংলা গান রহিয়াছে—‘হারজিত চিরদিন থাকবে তবুও এগিয়ে যেতে হবে, বাধাবিঘ্ন না পেরিয়ে বড় হয়েছে কে কবে?’ গানটিতে হারজিতের কথা বলা হইয়াছে খেলাধুলার প্রসঙ্গে। এখন, খেলাধুলা করিবার সুযোগই যদি না থাকে, তাহা হইলে হারজিত থাকিবে কী করিয়া আর বাধাবিঘ্ন সামলাইবার শিক্ষাই বা আসিবে কোথা হইতে?

খেলাধুলা করিতে হইলে প্রথম শর্ত হইল একটি মাঠ। খেলার উপযুক্ত মাঠ। কিন্তু দেশে এখন মাঠ কোথায়? আমাদের বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে অল্প বয়সি এবং তরুণদের সংখ্যা সবচাইতে অধিক। বাংলাদেশে এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অর্থাত্ ১৫ হইতে ৬৪ বত্সর বয়সি জনসংখ্যার আধিক্যের অবস্থাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। ইহা দারুণ একটি সুবিধা। একটি দেশের উপযুক্ত মানবসম্পদ সেই দেশটিকে অভাবিত উচ্চতায় লইয়া যাইতে পারে। বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ রহিয়াছে। কিন্তু এই আশীর্বাদই অভিশাপ হইয়া যাইতে পারে, যদি আমাদের নবীন জনগোষ্ঠী খেলাধুলার মাঠ না পায়, মানসিক বিকাশের যথাযথ পরিবেশ না পায়। সম্প্রতি ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলিয়াছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ করিতে চাহেন তিনি। লক্ষ্মীবাজারের একটি মাঠ উদ্ধার করিয়া তিনি এই বার্তা দেন যে, প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের সন্তানদের খেলার মাঠের ব্যবস্থা করিবেন।

অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে। তবে ইহা যেন কেবল ‘লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির’-এর মতো না হয়। কারণ, বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের মাঠ নাই বলিলেই চলে। অথচ আধুনিক নগরজীবনে পার্ক ও মাঠকে বলা হয় ‘নগরের ফুসফুস’। কিন্তু গত দুই দশকে ঢাকার দুই-তৃতীয়াংশ মাঠ সম্পূর্ণ হারাইয়া গিয়াছে, অনেক মাঠের আংশিক বেদখল হইয়া গিয়াছে। এমনিতেই বাংলাদেশের শহরগুলির জনসংখ্যা যেইখানে এত অধিক সেইখানে শিশু-কিশোরদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য আরো অধিক দরকার খোলা পরিবেশ, নির্মল বায়ু আর খেলার মাঠের। সেইখানে খোলা পরিবেশ কিংবা খেলার মাঠের দেখা পাওয়া দূরের কথা, শহরের ভিতরের হাতেগোনা যেই সকল মাঠ রহিয়াছে তাহার অধিকাংশই বিভিন্ন ক্লাব কিংবা সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে। ফলে এইগুলিতে প্রবেশাধিকার পাইতেছে না নগরীর সাধারণ জনগণ বা শিশু-কিশোররা। এই কারণে বর্তমান প্রজন্মের নবীনদের জীবন হইতে খেলাধুলার অধ্যায় লাপাত্তা হইয়া গিয়াছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্কুলেও খোলা প্রান্তরে দুরন্তপনায় মাতিয়া উঠার মতো কোনো জায়গা নাই। শিক্ষার্থীর পিঠে ভারী ব্যাগ, বাবা-মায়ের চোখে সন্তান বড় করিবার স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন কি স্বপ্নই থাকিবে, নাকি বহুক্ষেত্রেই তাহা দুঃস্বপ্নে পরিণত হইবে? চিত্তবিনোদনের জন্য খেলার মাঠ সংকুচিত হইয়া পড়িবার কারণে নবীনরা যদি চার দেওয়ালের মধ্যে আটকা পড়ে, তাহাদের জীবন যদি টিভি-কম্পিউটার ও ভিডিও গেমসে মনিটর-বন্দি হইয়া পড়ে, তবে তাহাদের মানসিক বিকাশের ভয়াবহ অবনতি ঘটিবে। ঘটিবে কি, তাহাই ঘটিতেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই সর্তক করিতেছেন যে, খেলাধুলার অভাব ছাত্রছাত্রীদের শরীরে ও মনে কুপ্রভাব ফেলিবেই। নবীনরা যখন একসঙ্গে মিলিয়া-মিশিয়া খেলাধুলা করে, তখন তাহারা মানসিকভাবে অনেক সুগঠিত ও সুসংগঠিত হয়। সমাজের জন্য ইহার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমাদের এত কোটি কোটি তরুণ, আমরা কেন বিশ্বের খেলাধুলায় এতটা পিছাইয়া থাকিব? তাহা ছাড়া, খেলাধুলায় ব্যস্ত না থাকিলে নবীনদের অলস মস্তিষ্কে শয়তান বাসা বাঁধে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় কোনো শূন্যস্থান কখনো শূন্য থাকে না। উহাতে কিছু না কিছু দিয়া পূর্ণ হইয়া যায়। তেমনই শিশু কিশোর তরুণরা খেলাধুলার পরিবেশ না পাইলে সেই শূন্য স্থানে বিবিধ অপরাধ, মাদকাসক্তির ঘটনা জাঁকিয়া বসে। সুতরাং খেলাধুলার মাঠ বন্ধ করিয়া আমরা কোথায় চলিতেছি, তাহা ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন।