চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুবাইতে ছিলাম ১১ দিন। একটি মশাও দেখিনি দুবাই জুড়ে। উড়োজাহাজ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ডিংয়ের পর দরজা খোলার পর মশারা হুড়মুড় করে বিমানে ঢুকে পড়ল। তার পর শুরু হলো বাংলা মশার জুলুম। যেদিন যাচ্ছি সেদিন বিমানে প্রচুর মশার কামড় খেয়েছি আর বিমান উড্ডয়নের পর দেশের সীমানা পেরোলেও সেই মশার জুলুম-অত্যাচার কমেনি। বোধ করি বাংলাদেশের মশারা দুবাইতেও আমাদের সঙ্গে করে গিয়েছিল। যে পরিমাণ কামড় দিয়েছে আমার দেশি মশা, ১১ দিনেও দাগ আর ফোলা কমেনি।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। চলতি অভিযানে মশা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কঠিন কাজ। ধারণা করা হচ্ছে, মশা না কমে যেভাবে বাড়ছে তাতে আগামী এপ্রিলে মশার ঘনত্ব বেড়ে চরমে পৌঁছাবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে কীট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। মশা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন ড. কবিরুল বাশার। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, মশার ঘনত্ব অন্য সময়ে যা থাকে তার চেয়ে চার গুণ বেশি বেড়েছে এখন। মশার এ যাতনা উভয় সিটি করপোরেশনের জন্য মোটেও সুখকর নয়। এ বছর রাজধানীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় মশার উত্পাত একটু বেশিই। মশার দাপট আরো নাকি বাড়বে!
আমাদের মনে রাখা উচিত, বিশাল বিশাল অট্টালিকার বাইরেও এ মহানগরীতে প্রায় চল্লিশ লাখ লোক বস্তিতে বসবাস করে সামর্থ্যহীন এ লোকগুলোর জীবন জীবিকার দায়ভার বহন করাই যখন কষ্টসাধ্য, সেক্ষেত্রে মশার উপদ্রব থেকে নিজেকে রক্ষার বিকল্প তাদের আর কীই-বা থাকতে পারে। এ নগরীর রক্ষাকর্তারা কি তা কোনোদিন ভেবে দেখেছেন? ঢাকা সিটি করপোরেশন মশা নিধনের ব্যাপারে বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে নগরবাসীকে মশা থেকে রক্ষার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ছাড়া মশক নিধন কর্মীদের নগরীর অন্য কোথাও দায়িত্ব পালন করতে খুব একটা দেখা যায় না। যদিও ডিসিসি কর্তৃপক্ষ বলছেন, লিকুইড ইনসেক্টিসাইড নামক কীটনাশক দিয়ে নগরীতে উড়ন্ত মশা নিধনের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। কিন্তু মানুষ এখনো তার বাস্তবায়ন পরখ করতে পারছে না। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আবদ্ধ ডোবানালা ও ড্রেনগুলোয় মশার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসিসিকে আরো জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। বলার অপেক্ষা রাখে না, মশা নিধনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জবাবদিহিতা ও মনিটরিংয়ের অভাবও। কোথাও কোথাও ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা ফগার মেশিন চালিয়ে মশা দমন আদৌ সম্ভব নয়। মশা দমন ও নিধন করতে হলে মশার প্রজনন ক্ষেত্রের দিকে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিতে হবে। গোটা শহর কার্যত ময়লা-আবর্জনায় ভাগাড় হয়ে আছে। রয়েছে মাইলের পর মাইল খোলা নর্দমা। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা ময়লা ফেলার জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় ফেলা ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। ময়লা ফেলার স্থানগুলো মশা প্রজননের উত্কৃষ্ট ক্ষেত্র। খোলা নর্দমাগুলোও যথাসময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। মশার বংশবিস্তারে নর্দমাগুলোর বড় রকমের ভূমিকা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি জলাশয়ই ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পূর্ণ। এগুলোও মশার উত্স হিসেবে কাজ করছে। মশার প্রজননস্থলসমূহ অবারিত ও উন্মুক্ত রেখে মশা দমন ও নিধনে সফল হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না। প্রজনন ও উত্সস্থলেই মশার বংশ ধ্বংস করতে হবে। আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। আবর্জনা ফেলার জায়গাগুলো সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ঐ সব জায়গায় মশার জন্ম হতে না পারে। খোলা নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে, ওষুধ দিতে হবে—যাতে সেখানে মশা জন্মাতে না পারে। একইভাবে জলাশয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়ে মশার লাভা মুক্ত করতে হবে। সিটি করপোরেশনদ্বয়কে এই সত্য উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ওয়ার্ড কমিশনারদের আরো দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হতে হবে।
ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশার অত্যাচার। চায়ের দোকানে বসলেই মশা কামড়াতে শুরু করে। এলাকার নর্দমাগুলোতে আবর্জনা জমে থাকে। ডিসিসি আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করে না। এলাকাবাসীও নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখে না। তাই, মশারা রাতেও কামড়ায়, দিনেও কামড়ায়। আগে দিনের বেলা এরা আন্ডারগ্রাউন্ডে অর্থাত্ ম্যানহোলে আত্মগোপন করে থাকত। রাতে বেরিয়ে আসত। এখন দিনরাত সব সময়ই এদের সমান আনাগোনা। রাতে বরং এদের আনাগোনা থেকে বাঁচার জন্য মশারির ভেতর আশ্রয় নেওয়া যায় কিন্তু দিনের বেলায় মানুষের দিবানিদ্রার অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে দিব্যি হুল ফুটিয়ে দেয় মশা।
মশা ক্ষুদ্র কীট। কিন্তু তার বিধ্বংসী ক্ষমতা ক্ষুদ্র নয়। বলা হয়, রাজা নমরুদকে জব্দ করতে আল্লাহ পৃথিবীতে মশা পাঠিয়েছিলেন। মশার কামড়ে ধ্বংস হয়ে যায় নমরুদ বাহিনী। আত্মগর্বী রাজার জন্যও মৃত্যু ডেকে আনে এই ক্ষুদ্র কীট। বিপদ না চাইলে সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। নিজেদের সুনামের স্বার্থেই মশা নামের ভয়ংকর শত্রুকে ঠেকাতে হবে।
n লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট
