সড়ক দুর্ঘটনা কমবে কীভাবে?

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ২১:১২

মো. সালাহউদ্দিন

 

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মূল ভূমিকা পালন করেন চালক নিজে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য চালককে দায়ী করব—কারণ গাড়ি বের করার আগে গাড়ির চাকা থেকে শুরু করে সবকিছু দেখে  নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। মহাসড়কে অনেক সমস্যা আছে ঠিক এবং ইচ্ছে করলেই সমস্যাগুলো অচিরেই সমাধান করা সম্ভব নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে প্রশিক্ষিত মানবিক ড্রাইভার তৈরি করতে হবে। একজন প্রশিক্ষিত ড্রাইভার কখনো হেলপার দিয়ে গাড়ি চালাতে পারেন না। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার আগে ট্রাফিক বিভাগ এবং বিআরটিএ কর্তৃক চালকদের রোড সাইন, রাত্রিকালীন গাড়ির হেডলাইটের যথাযথ ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইনের বেসিক বিষয়গুলোসহ মানবিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই—চালক প্রত্যেকেই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নন। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, মহাসড়কে যত দুর্ঘটনা ঘটে তার শতকরা আশি ভাগ হয় চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে। মহাসড়কে একই মানের একটা গাড়ির আরেকটাকে ওভারটেক করার প্রয়োজন নেই। অথচ আমরা দেখি পিছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক না করা পর্যন্ত যেন স্বস্তি পায় না। চালকদের এটা একটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যতদিন এই প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে ততদিন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ইমার্জেন্সি যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি আর একটা গাড়িকে ওভারটেক করার প্রয়োজন হতে পারে। মহাসড়কে চলার জন্য আমি দুটি রোড সাইনের কথা বলব। একটা সাইন থাকে সোজা রাস্তায় সাদা ফাঁকা ফাঁকা দাগ—এখানে একজন চালক ইচ্ছা করলে ওভারটেক করতে পারেন। আর একটা সাইন থাকে রাস্তার বাঁক এলাকায়, ব্রিজের ওপর কিংবা বাজার এলাকায়। যতক্ষণ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখান দিয়ে সাদা লম্বা দাগ চলে গিয়েছে  সেই জায়গায় ওভারটেক করা সম্পূর্ণ নিষেধ। রাস্তার বাঁক এলাকায় এই চিহ্ন দেওয়া সত্ত্বেও আমাদের চালকেরা এই রোড সাইন না বুঝে ওভারটেক করার চেষ্টা করেন, ফলে ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা। আমাদের  দেশে অতীতে যে মারাত্মক দুর্ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে তার বেশিরভাগ ঘটেছে রাস্তার বাঁকে। ওভারটেক করার নিয়ম হলো ঝামেলামুক্ত জায়গায় সোজা রাস্তায় পিছনের গাড়ি রাইট ইন্ডিকেটর দিলে সামনের গাড়ি যদি লেফট ইন্ডিকেটর দেয়, সেক্ষেত্রে পিছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই বাম পাশ দিয়ে ওভারটেক করা যাবে না। 

যেহেতু আমাদের দেশে মহাসড়ক সুরক্ষিত নয়, তাই গাড়ির গতি কমাতে হবে। বাসের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার এবং ট্রাকের জন্য ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার এবং প্রাইভেট গাড়ির জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। অধিক গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য গাড়ির মালিকেরা অনেকাংশে দায়ী; কারণ তাঁরা অনেকক্ষেত্রে সময় বেঁধে দেন। মালিকদের কথামতো গাড়ি না চালালে অনেকক্ষেত্রেই তাঁরা চাকরি হারান। এক্ষেত্রে চালকদের চাকরি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে। মাঝে মাঝে যাত্রীরা চালকদের অধিক গতিতে গাড়ি চালাতে উত্সাহিত করেন—এটা আমাদের পরিহার করতে হবে।

বর্তমানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেরা  বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর ফলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক; অথচ অনেককে হেলমেট বিহীন তিনজন নিয়ে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়। অনেকে তাঁর দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে নিয়ে অর্থাত্ মোট চারজন মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করেন—এটা খুবই দুঃখজনক। তাঁরা পুরো পরিবারকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

ফিডার রোড থেকে প্রধান সড়কে ওঠার নিয়ম হলো প্রথমে প্রধান সড়কের গাড়িকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তারপর ডানে বামে দেখে ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে হর্ন বাজিয়ে প্রধান সড়কে উঠতে হবে। অনেক চালক  কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে সাইড রোড থেকে প্রধান সড়কে উঠে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।

মোট দুর্ঘটনার ৩০ শতাংশ সংঘটিত হয় পথচারীদের সঙ্গে। পথ চলার নিয়ম না জানা একটি বড় কারণ। গাড়ি চলে বাম পাশ দিয়ে এবং পথচারীও হাঁটেন বাম পাশ দিয়ে, ফলে পিছন থেকে আঘাতজনিত কারণে তাঁরা দুর্ঘটনার শিকার হন। ডান পাশ দিয়ে হাঁটলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম থাকে, কারণ ডান পাশ ব্যবহার করলে পিছনে কোনো গাড়ি থাকে না—গাড়ি থাকে পথচারীর সম্মুখভাগে। রাস্তা পারাপারের নিয়ম হলো প্রথম ডানে তাকাতে হবে, তারপর বামে, পরিশেষে ডানে তাকিয়ে রাস্তা পার হতে হবে।  কোনো অবস্থাতেই অন্যমনস্ক হয়ে কিংবা দৌড়ে বা মোবাইলফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া যাবে না। পথচলার এই নিয়মটি প্রাইমারি লেভেলে পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ থাকা জরুরি।

মহাসড়কের দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সারা দেশে স্পিড গানের ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রতি জেলায় যদি গাড়িসহ দুটি টিম নিয়োগ করা যায় এবং প্রতিটিতে কমপক্ষে ৩০ কিলোমিটার এলাকা নির্ধারণ করে দিয়ে স্থান পরিবর্তন করে স্পিড গানের মাধ্যমে দ্রুত গতির গাড়িগুলো শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা অব্যাহত থাকে; তাহলে মহাসড়কে চালকরা দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে সাহস পাবে না। দ্রুত গতির গাড়ি শনাক্ত করার জন্য একজন পুলিশ সদস্য স্পিড গান এবং ওয়াকিটকিসহ যে কোনো গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকবেন। দ্রুতগতির গাড়িগুলো শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ প্রবণতা কমতে বাধ্য। যদি প্রতিটি টিমে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যায় এবং দ্রুতগতির গাড়িসহ মহাসড়কে চলাচলরত নসিমন-করিমন, ইজিবাইক, ভটভটি, থ্রি-হুইলার এবং ইঞ্জিনচালিত নিষিদ্ধ গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে নগদ জরিমানা আদায় অব্যাহত থাকে তাহলে সারা  দেশের মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণে আসতে বাধ্য এবং জাতি এই অভিশপ্ত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাবে। এই কাজটি ৬৪ জেলার মহাসড়কে একযোগে হতে হবে।

সকালের দিকে যে দুর্ঘটনাগুলো সংঘটিত হয় তার বেশিরভাগ ঘটে ঘুমের কারণে। একজন চালক আইন অনুসারে একটানা ৫ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারেন, অথচ অনেক সময় একজন চালক বিশ্রাম নেওয়া ছাড়াই একটানা ১৩-১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালান! মালিক-সমিতি এবং শ্রমিক-ইউনিয়ন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে দুর্ঘটনাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। পরিশেষে বলব, চালকদের প্রতি আমাদের সদয় হতে হবে এবং মহাসড়কের পাশে রাখতে হবে তাঁদের বিশ্রামের ব্যবস্থা।

পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন), ঝিনাইদহ

 

 

০