বেড়ায় কালির কারখানার ধোঁয়ায় বিপর্যন্ত পরিবেশ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ২২:৩৩

উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ গ্রামে কারখানা স্থাপন করে পাটকাঠি পুড়িয়ে কালি (কার্বন) তৈরি করা হচ্ছে। আর ঐ কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে রূপপুর, ভাটিকয়া, বৃন্দপাড়া, উজানকয়া ও হঠাত্পাড়া গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গ্রামগুলোতে ফসল উত্পাদন কমে গেছে, গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারখানার আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেরই শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী জানায়, বছর দুয়েক আগে উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ গ্রামের সাত বিঘা ফসলি           জমিতে ‘ইয়ং বাংলা ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ কোং লিমিটেড’ নামের ঐ কালি বা কার্বন তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। কারখানাটির মালিক উপজেলার কাশিনাথপুর এলাকার আমিনুল ইসলাম। কারখানায় নির্মাণ করা হয় বড় আকৃতির ১৬টি চুল্লি। সেই চুল্লিতে পাটকাঠি পুড়িয়ে তৈরি করা হয় কালি। এতে প্রচুর ধোঁয়া ও ছাইয়ের সৃষ্টি হয়। ঐ ধোঁয়া ও ছাইয়ে এলাকাবাসী হাঁচি-কাশিসহ শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কারখানার ছাই উড়ে গিয়ে আশেপাশের ফসলি জমিতে পড়ছে। এর সঙ্গে ধোঁয়া যুক্ত হয়ে এলাকায় ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকার মধ্যে কারখানাটি গড়ে উঠেছে। কারখানায় এমনিতেই ১৬টি চুল্লি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে আরো ১৬টি চুল্লি, যেগুলোর নির্মাণকাজ বর্তমানে চলছে। কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে আশপাশের ফসলি জমির মাটি ও গাছপালা কালো রঙ ধারণ করেছে। পুকুরের পানিও কালো হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, কারখানায় রাত ৯টা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে পাটকাঠি পোড়ানোর কাজ।

কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাটকাঠি পুড়িয়ে যে ছাই পাওয়া যায় তা চীনে রপ্তানি করা হয়। সেখানে এই ছাই থেকে কার্বন বা কালি জাতীয় উপকরণ তৈরি হয়। ৪০ কেজি পাটকাঠি পুড়িয়ে পাওয়া যায় ১০ কেজি ওজনের বিশেষ ধরনের ছাই।

ধর্মগঞ্জ গ্রামের কৃষক আকরাম আলী বলেন, কালো ধোঁয়ায় ভালোমতো নিঃশ্বাস পর্যন্ত নেওয়া যায় না। ধোঁয়ায় ফসল উত্পাদন দিনকে দিন কমছে। গাছের পাতা কালো হয়ে গেছে। এমনকি গাছে মুকুল পর্যন্ত আসেনি।’

 স্থানীয় গৃহবধূ আকলিমা খাতুন বলেন, ‘ধোঁয়ায় চোখ পোড়ে। জানালা দিয়া ঘরে ছাই আর ধোঁয়া ঢুইকা ভাত-তরকারি নষ্ট হইয়া যায়। ঘরের টিন ঝাঁঝরা হইয়া যাইতাছে। মনে হয় বাড়িঘর ছাইড়া অন্য কুনু জায়গায় চইলা যাই।’

 এদিকে ঐ কারখানার একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চুল্লির পাশে একটানা কাজ করলে নাক ও মুখের ভেতরে জ্বালাপোড়া করে। ক্ষুধা থাকে না, ঘুম হয় না। একেবারে অভাবি না হলে এ কারখানায় কাজ করতে চায় না কেউ।

কারখানার প্রধান পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ধোঁয়ায় পরিবেশের হয়তো কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে। তবে ফসলের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। শুরুতে আমরা চুল্লির সঙ্গে ১৮ ফুট চিমনি বসিয়েছিলাম। এখন চিমনির উচ্চতা আরো অনেক বেশি বাড়ানোর কাজ চলছে। এর ফলে পরিবেশের আর কোনো ক্ষতি হবে না।’

বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা (আরএমও) জাহিদ হাসান সিদ্দিক বলেন, ‘কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে বাতাসে বিষাক্ত কার্বন মনো-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। নির্গত ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসের বিভিন্ন জটিল রোগ হতে পারে। এটা দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।’

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, ‘কারখানাটির কারণে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি।’  

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশকর আলী বলেন, ‘কারখানা কর্তৃপক্ষ এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পেলেও তারা ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছে বলে আমাকে কাগজপত্র দেখিয়েছে। পরিবেশ দূষণ যাতে না হয় সে জন্য কারখানার চুল্লির চিমনির উচ্চতা ১৮ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৮০ বা ১০০ ফুটের কাছাকাছি নেওয়ার কাজ চলছে। এ জন্য আপাতত আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চিমনির উচ্চতা বাড়ানোর পরেও পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’