‘ধন চাহো তো তাহা হইলে এই পথে আসিও না’

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ২১:৪৫

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক পার্থক্যটি হইল, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাই প্রদান করা হয় না, সেইখানে গবেষণাও হইয়া থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণা কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। মানসম্পন্ন মৌলিক গবেষণা কেবল জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতিকেই ত্বরান্বিত করে না, তাহা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণেও অবদান রাখে; কিন্তু শিক্ষাদান আর গবেষণা কার্যক্রমকে পাশ কাটাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন রাজনীতিতে জড়াইয়া পড়েন এবং সেই রাজনীতি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কতটা সহায়ক—এই প্রশ্নটি যখন সামনে চলিয়া আসে, তখন তাহা চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়ায়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকদের দলভিত্তিক রাজনীতি লইয়া আলোচনা-সমালোচনা দীর্ঘদিনের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের রাজনীতি অতীতেও ছিল; তাহা যতটা না দলীয় রাজনীতি, তাহার চাইতেও অধিক ছিল আদর্শিক। শিক্ষকরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে নহে, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও শিক্ষকরা রাজনীতিতে জড়াইয়া থাকেন। এডুকেশন পলিসি, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট, হেলথ পলিসি—প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাহারা আদর্শিক জায়গা হইতে নীতিনির্ধারক কিংবা পরামর্শকের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি হইবে কল্যাণমুখী—ইহাই কাম্য। তাহারা রাজনৈতিক সচেতন হইবেন, উপদেশ দিবেন, সমালোচনা করিবেন; কিন্তু নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করিবেন না। সেই আদর্শিক জায়গা হইতে দূরে সরিয়া তাহারা যখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আনুগত্য স্বীকার করিয়া লন এবং সেই দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিয়োজিত থাকেন, তখন তাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে।

বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখিয়াছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতির নামে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, পদ-পদবির জন্য অপরাজনীতি আর কলহে লিপ্ত হইয়া থাকেন। শিক্ষক নিয়োগ হইতে শুরু করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন পাইতে কিংবা দিতে রাজনৈতিক বিবেচনাই মুখ্য হইয়া দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাইবেন সর্বোচ্চ মেধাবীরা। সেইখানে মেধাকে বিবেচনা না করিয়া যখন রাজনৈতিক পরিচয় বড় করিয়া দেখা হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান তলানিতে গিয়া পৌঁছায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়, অস্থিরতা তৈরি হয় সার্বিক শিক্ষাকার্যক্রমে। এই কথাটি সত্য—কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নহে, যেইখানেই নির্বাচনব্যবস্থা থাকিবে, সেইখানে রাজনীতিও থাকিবে; কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রতি শিক্ষকদের অতিরিক্ত আনুগত্য কখনোই কাঙ্ক্ষিত নহে। দেখা যাইতেছে, দলের প্রতি কে কাহার চাইতে অধিক অনুগত তাহার প্রতিযোগিতা চলিতেছে। অথচ তাহাদের রাজনীতি হওয়া উচিত শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়া, পেশাগত উত্কর্ষতা বৃদ্ধিকে সামনে রাখিয়া। শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকিতেই পারে; কিন্তু তাহা কখনোই যোগ্যতার মানদণ্ড হইতে পারে না। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ঊর্ধ্বে একাডেমিক এক্সিলেন্সিই হওয়া উচিত পদ-পদবি কিংবা নিয়োগের মানদণ্ড।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাতির বিবেক, তাহারা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মান-মর্যাদা নিঃসন্দেহে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষকতার ব্রত সম্পর্কে বলিয়াছিলেন, ‘ধন চাহো তো তাহা হইলে এই পথে আসিও না। মান চাহো তো তাহা হইলে এই পথে আসিও। তিন্তিড়ী বৃক্ষের পত্র ভক্ষণকরত জীবন ধারণ করিতে চাহো, তাহা হইলে এই পথে আসিও। বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষকতার এই মহান ব্রত সর্বাত্মক মানিয়া চলা সম্ভব না হইলেও শিক্ষকদের আদর্শ এবং নৈতিকতা শিক্ষার্থীদের নিকট রোল মডেল হইবে—ইহাই প্রত্যাশা। তাহাদের রাজনীতিও হইবে শিক্ষার্থী কল্যাণমুখী এবং যাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রাখে। একজন শিক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব পাইতেই পারেন, তবে তাহার উচিত নিজের মান-মর্যাদা বজায় রাখিয়া, সকল প্রকার লোভ-লালসা, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠিয়া নিষ্ঠার সহিত সেই দায়িত্ব পালন করা।